ঘুরে আসুন বইয়ের জাহাজে!

ঘুরে আসুন বইয়ের জাহাজে!

নিউজডেস্ক২৪: যারা বইয়ের মাধ্যমে নিজেদের আলোকিত করতে চান তাদের একান্ত ঠিকানা বাতিঘর। এক কাপ ধূমায়িত চায়ের সাথে আনকোরা বইয়ের গন্ধ আপনার অবসর সময়কে করে তুলবে আরও উপভোগ্য। এমনই এক তৃপ্তির আশায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যায় চট্টগ্রামের বাতিঘরে।

জামাল খান রোডের প্রেস ক্লাবের নিচতলায় চট্টগ্রামের বাতিঘরের অবস্থান। বন্দর নগরী চট্টগ্রামের মানুষের অবসর সময় কাটানোর অন্যতম জায়গা হলো বাতিঘর। রোজ হাজার হাজার বই প্রেমীদের আসর বসে এই বাতিঘরে। টুকটাক বই পড়ার সুবাদে এবং চট্টগ্রামের ঝটিকা সফরে আমি গিয়েছিলাম জাহাজের আদলে তৈরি করা বন্দর নগরী চট্টগ্রামের বাতিঘরে।

ঢাকার প্রবাসী ইকবাল ভাইয়ের জন্মস্থান চট্টগ্রামে। ‘প্রবাসী’ বললাম কারণ তার মতে, চট্টগ্রামের বাইরে আসলে নাকি নিজেকে তার প্রবাসী মনে হয়। তার মুখেই শুনেছি চট্টগ্রামের বাতিঘরের গল্প। হুট করে চট্টগ্রাম যাওয়ার পরের দিন গিয়ে দেখি সেও আসছে চট্টগ্রামে। অপরিচিত শহরে পরিচিত মানুষ পেলে কার না ভালো লাগে!

ইকবাল ভাইয়ের সাথেই আমি বন্দর নগরী চট্টগ্রামের বাতিঘরে যাই। সাথে ছিলেন আরেক বড় ভাই সৌরভ জামান। বাকিরা রিকশায় গেলও আমি সৌরভ ভাইয়ের বাইকে করে যাই। সে যাই হোক, বাতিঘরে ঢুকেই এত বই একসাথে দেখে মন আনন্দে ভরে উঠলো। শুরুতে চারপাশের দিকে তেমন খেয়াল না করেই বই দেখা শুরু করি। হুঁশ ফেরে ইকবাল ভাইয়ের কথায়। ‘তুই কি খেয়াল করছিস, বাতিঘর জাহাজের আদলে তৈরি করেছে?’

প্রথম দেখায় আমি বুঝতেই পারিনি যে এটি জাহাজের কেবিনের আদলে তৈরি করা হয়েছে। বুঝতে একটু সময় লাগলেও ততক্ষণে চক্ষু চড়ক গাছ। এই রকম কিছু তৈরি করা যেতে পারে তা আমার মাথায় আসেনি। জাহাজের কেবিনের আদলে তৈরি করবেই না কেন! বন্দর নগরী বলে কথা। জাহাজের ন্যায় মেঝেতে কাঠের পাটাতন বিছানো। ছাদ থেকে ঝুলছে নোঙর ফেলার মোটা মোটা দড়ি।

জানালার ফ্রেমগুলো তৈরি করা হয়েছে জাহাজের জানালার আদলে। সম্পূর্ণ জাহাজের আদলে এর অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা। শীততাপ নিয়ন্ত্রিত পুরো জায়গা। বিপুল সংখ্যক বইয়ের সম্ভার নিয়ে ভিন্ন ধর্মী আদলে তৈরি এই বাতিঘর চট্টগ্রাম নগরীতে বই প্রেমীদের প্রাণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে, চট্টগ্রামের দর্শনীয় স্থানের তালিকায়ও জায়গা করে নিয়েছে।

গাঁও-গ্রাম থেকে উঠে আসা এক বইপ্রেমী তরুণের অসম্ভব ইচ্ছা শক্তি আর কঠোর পরিশ্রমে আজকের এই বাতিঘর। তার নাম দীপংকর দাশ। চট্টগ্রামের পটিয়া ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের তীর্থস্থান। আর সেই চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ধলঘাট নামক গ্রামে জন্ম দীপংকরের। সেখানেই স্কুল জীবন। কলেজ পড়ার জন্য আসেন পটিয়ায়। বাংলা ভাষা এবং সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। ছোটবেলা থেকে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহী।

এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন সাহিত্য সংগঠনের সাথে যুক্ত হোন। এই ধারাবাহিকতার রক্ষার্থে বিশ্ব সাহিত্যের কান্ডারি, আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগর ও শিক্ষাবিদ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সাহচার্যে এসেছেন। ১৯৯৭ সালে পটিয়ায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রীয় শাখা গঠিত হলে দীপংকর দাশ হন এই শাখার সংগঠক। সেই সুবাদে প্রকাশকদের সাথে গড়ে ওঠে সুসম্পর্ক। আর ২০০১ সালে চট্টগ্রাম শহরে গড়ে তোলে ভ্রাম্যমাণ লাইবেরি।

২০০৫ সালে চেরাগির মোড়ে ছোট পরিসরে গড়ে তোলেন বাতিঘর। বিচিত্র সব বইয়ের সংগ্রহের কারণে অল্প সময়ে নজর কাড়ে পাঠক মহলের। এরপর শুধু সামনের দিকে এগিয়ে চলা। বন্দর নগরীর সাথে সামঞ্জস্য রেখে শিল্পী শাহীনুর রহমানের ডিজাইনে প্রেসক্লাবের নিচ তলায় দুই হাজার বর্গ ফুটের মতো জায়গা নিয়ে গড়ে তোলেন বাতিঘর।

সব মানুষের মনে বইয়ের আলো ছড়িয়ে দিতে সুবিশাল আর বৈচিত্র্যময় বইয়ের সম্ভার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বাতিঘর। কী নেই এখানে! শিশুতোষ কর্নার থেকে শুরু করে বসে বই পড়ার ব্যবস্থা সহ কফি কর্নারে শিল্পী-সাহিত্যিকের আড্ডা দেওয়ার স্থান। প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু অনুষ্ঠান লেগে আছে বাতিঘরে। প্রতিনিয়ত মনের ক্ষুধা মেটাতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে বাতিঘর। দেশি বিদেশি বইয়ে ঠাসা এই বইয়ের জাহাজ।

সব ধরনের বইয়ে ভরা এই বাতিঘর। শিশুদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা একটি কর্নার আছে। যেখানে শিশুরা মনের আনন্দে নিজের ইচ্ছেমতো বই পড়তে এবং কিনতে পারে। আছে আলাদা আলাদা প্রকাশনা কর্নার। দেশি বিদেশি প্রকাশনা আলাদা। আর আছে নির্বাচিত লেখক কর্নার। বাদ যায়নি ম্যাগাজিন এবং ক্যাফে কর্নারও। এক কথায় গ্রন্থপ্রেমীদের জন্য এক টুকরো স্বর্গ।

বই কেনার জন্য কোনো জোরাজুরি নেই। যে কেউ তার ইচ্ছে মতো বই পড়তে পারে এখানে বসে। বসার জন্য রয়েছে আরামদায়ক ব্যবস্থা।

সময়ের তালে পা ফেলে রোজ একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে বাতিঘর। সংযোজন হচ্ছে নতুন নতুন বই। বাতিঘরের ফেসবুক পেজের মাধ্যমে ঘরে বসেই আপনি পেয়ে যাবেন আপনার কাঙ্ক্ষিত বই। নিয়মিত গ্রাহকদের জন্য প্রিভিলেজ কার্ড তো আছেই।

শিক্ষাবিদ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের একটি কথা আছে- ‘মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়’। আর তার প্রমাণ দীপংকর দাশ দিয়েছেন। সায়ীদ স্যারের আলোকিত মানুষ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে তাঁর শিষ্য দীপংকর দাশ বইয়ের আলোয় ভরিয়ে দিতে চান এই ভুবনকে।

যেভাবে যাবেন

ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম গামী যে কোনো বাসে উঠে পড়ুন। নন এসি ভাড়া ৪২০ থেকে ৪৮০ টাকা। চট্টগ্রামের জিইসির মোড়ে নামুন। সেখান থেকে সিএনজি বা রিকশা করে বাতিঘর।

থাকা-খাওয়া

আশেপাশে খাবারের ভালো দোকান আছে সেখানে খেয়ে নিতে পারেন। আর থাকার জন্য ভালো মানের হোটেল পাবেন ষ্টেশনের কাছে।