উত্তর মেরুতে জাহাজ চলাচলের পথ তৈরি

উত্তর মেরুতে জাহাজ চলাচলের পথ তৈরি

নিউজডেস্ক২৪: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্রমে উত্তর পশ্চিম গোলার্ধের বরফের মাঝে খোলা পানির জায়গার পরিমাণ বাড়ছে। এটা একসময়ে বিশ্বের মালামাল পরিবহনের জাহাজ চলাচলের সবচেয়ে বড় পথ হয়ে দাঁড়াতে পারে।  উনিশ শতকের দিকে এই এলাকা দিয়ে, আর্কটিক সাগরে জাহাজ চলাচলের একটি পথ খুঁজে বের করতে অনেক প্রতিযোগিতা চলেছে। সেসময়ে এটি সম্ভব হলে উত্তর আটলান্টিক সাগরের সঙ্গে উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের একটি সংযোগ তৈরি হতো।

কিন্তু সমস্যা হলো, এমনি গ্রীষ্মের সময়েও এই রুটটি শক্ত বরফে আটকে থাকে। এই পথে সবচেয়ে ভয়াবহ আর আলোচিত অভিযানগুলোর একটি ছিল ব্রিটেনের স্যার জন ফ্রাঙ্কলিনের ১৮৪৫ সালের অভিযান। যে অভিযানের সময় তার দুইটি জাহাজ বরফে আটকে গিয়ে ১২৯ জন ক্রু মেম্বারের সবাই মারা যায়।

বর্তমানে, ১৭০ বছর পরে একটি উষ্ণ আর্কটিক সাগরের মানে, প্রতি গ্রীষ্মে অন্তত কয়েকমাসের জন্য এই পথটি জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে। যা জাহাজ চলাচলের জন্য আর্থিকভাবে সাশ্রয়ী হবে। চীন বা জাপান থেকে ইউরোপ অথবা যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে মালামাল পরিবহনের ক্ষেত্রে এই পথটি হাজার কিলোমিটার যাত্রাপথ কমিয়ে দেবে। বর্তমানে সুয়েজ খাল বা পানামা খাল দিয়ে যাদের যাতায়াত করতে হচ্ছে।

যদিও এই মুহূর্তে এটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ একটি ব্যাপার। কারণ এই পথের বরফ জাহাজগুলোর জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারে। তবে ২০১৪ সালে নুনাভিক নামের একটি জাহাজ এই পথে কোন পাহারাদার ছাড়াই কানাডা থেকে নিকেল নিয়ে চীনে পৌঁছেছে।

সেই জাহাজ কোম্পানির ম্যানেজার টিম কেইন, যিনি নিজেও সেই যাত্রাপথে ছিলেন। তিনি বলছেন, পুরো যাত্রাটাই ছিল একঘেয়ে, জাহাজটাকে একদিনও পুরোপুরি বরফের সঙ্গে লড়াই করতে হয়নি। এই পথে জাহাজটির সময় লেগেছিল মাত্র ২৬ দিন, অথচ ফিরতি পথে পানামা খাল হয়ে আসতে সময় লেগেছে ৪১দিন।

এই মুহূর্তে এই পথে যাতায়াতকারী জাহাজের সংখ্যা খুবই কম, কিন্তু সংখ্যাটি আস্তে আস্তে বাড়ছে। ২০১৭ সালে এই পথে মোট ৩২টি জাহাজ চলাচল করেছে। তার মধ্যে কার্গো শিপ যেমন আছে, তেমনি আছে ইয়াট আর একটি ক্রুজ শিপও। একবছর আগেও এই পথে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৬টি।

কানাডার সাগর বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, এই এলাকায় খনির কার্যক্রম আরো বাড়লে জাহাজ চলাচলের সংখ্যাও আরো বাড়বে। তবে কোন কোন আর্কটিক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই পথটি বাণিজ্যিকভাবে খুব একটা জনপ্রিয় বা সহজ হবে না।

আর্কটিক ইন্সটিটিউটের প্রধান মাল্ট হামপের্ট বলেন, এই পথে পরিষ্কার রুট কমই আছে, বিশেষ করে যেখানে বরফে আচ্ছাদিত অনেক ছোট ছোট দ্বীপ রয়েছে। আরেকটি চ্যালেঞ্জ হচ্ছে এখানে গভীর সমুদ্র বন্দরের অভাব আর উদ্ধার কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা।

এই পথে প্রবেশাধিকার নিয়েও অনেক মতভেদ রয়েছে। কানাডা এখানে সার্বভৌমত্ব দাবি করে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্য দেশগুলো এই পথটিকে আন্তর্জাতিক বলে মনে করে। কিন্তু এই পথে বিনিয়োগের প্রশ্ন আসলে রাশিয়ান আর্কটিকের তুলনায় আলাস্কা, কানাডা বা গ্রিনল্যান্ডের পথটি পিছিয়ে রয়েছে। উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি বৃদ্ধি করার চেষ্টা করছে রাশিয়া, ফলে সামনের কয়েক বছরে পারমানবিক আইস ব্রেকারের পেছনে দেশটি মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে।

মানিটোবার হাডসন বেতে বন্দর নগরী চার্চিলে একটি গভীর সমুদ্র বন্দর করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে কানাডাও। এই পথের দিকে তাকিয়ে রয়েছে চীনও। আর্কটিক ৩৬০ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক জেসিকা শাহডিয়ান বলেন, উত্তর আমেরিকান আর্কটিকের উন্নয়নের সঙ্গে আরো বেশি গভীরভাবে জড়িত হতে চাইছে চীন, কারণ এটি তাদের ইউরোপ এবং অন্যত্র যোগাযোগের ক্ষেত্রে বেশি সুবিধা দেবে। সুতরাং এই পথে আমেরিকান এবং কানাডার আরো বেশি মনোযোগ দেয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন। এই পথ পুরো উত্তরের অর্থনীতি বদলে দিতে পারে।