কোলন ক্যান্সার: কারণ ও লক্ষন, চিকিৎসা এবং প্রতিরোধ

কোলন ক্যান্সার: কারণ ও লক্ষন, চিকিৎসা এবং প্রতিরোধ

নিউজডেস্ক২৪: যেসব ক্যান্সার কোলন (বৃহদন্ত্র) এবং মলদ্বারকে আক্রান্ত করে তাদের কোলোরেকটাল ক্যান্সার বা কোলন ক্যান্সার বলে। এটি নারীদের মধ্যে ক্যান্সার দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণরে জন্য দ্বিতীয় কারণ এবং পুরুষদের জন্য তৃতীয় কারণ। কোলোরেক্টাল ক্যান্সার ধীরগতিসম্পন্ন হলেও মারাত্মক। একটি মারাত্মক ক্যান্সার যা শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে এবং তাদের ক্ষতি করতে পারে। তবে আশার কথা হলো, স্ক্রীনিং কৌশল এবং চিকিত্সার উন্নতির কারণে, কোলরেটাল ক্যান্সার থেকে মৃত্যুর হার দিন দিন কমছে।

কোলন ক্যান্সার এর ঝুঁকির কারণঃ

কোলন ক্যান্সারের সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণগুলি হচ্ছে:

  • বুড়ো বয়স (৫০ বছর)।

  • উচ্চমাত্রায় প্রোটিন বা চর্বিযুক্ত খাদ্য।

  • কম আশজাতীয় খাদ্য।

  • অধিক মদ্যপান।

  • ধূমপান।

  • যাদের স্তন, ডিম্বাশয় বা গর্ভাশয়ের ক্যান্সার ছিল।

  • কোলোরেকটাল ক্যান্সারের পারিবারিক ইতিহাস।

  • কোলনের রোগ, যেমন- কোলাইটিস, আইবিডি।

  • অতিরিক্ত ওজন এবং স্থূলতা।

কোলোরেক্টাল ক্যান্সার এর লক্ষণসমূহ ঃ

  • অন্ত্রের অভ্যাস পরিবর্তন—ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্য

  • মল ত্যাগের পর অন্ত্র যথাযথভাবে খালি না হওয়ার অনুভূতি

  • কালো রঙের পায়খানা

  • মলদ্বার দিয়ে রক্ত যাওয়া

  • পেটের ব্যথা, পেট ফুলে যাওয়া

  • না খাওয়ার পরও পেটের পূর্ণতা অনুভব করা

  • অনিচ্ছাকৃত ওজন হ্রাস

  • পেটে চাকা বা পিন্ডের মতো কিছু অনুভব করা

কোলোরেক্টাল ক্যান্সার নির্নয় ঃ

স্ক্রিনিং এর মাধ্যমে কোলোরেক্টাল ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্ত করা গেলে প্রতিকারের সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। কলোরেক্টাল ক্যান্সারের জন্য সাধারণ স্ক্রীনিং এবং ডায়গনিস্টিক পদ্ধতিগুলি নিম্নরূপঃ

  • পূর্ণ রক্ত পরীক্ষা/complete blood test (সিবিসি/CBC)।

  • মলে রক্তের উপস্থিতির পরীক্ষা (occult blood test in stool)।

  • রক্তে টিউমার মার্কার পরীক্ষা—সিইএ (CEA)।

  • বারিয়াম এনেমা এক্স-রে।

  • সিগময়েডস্কোপি, কোলনস্কোপি (এবং তা দিয়ে নেয়া বায়প্সি)।

  • সিটি কলোনোগ্রাফি।

  • রোগ অন্য অংশে ছডিয়ে পড়েছে কি না তার পরীক্ষাঃ

    • লিভার ফাংশনের রক্ত পরীক্ষা।

    • পেটের আল্ট্রাসাউন্ড বা এম.আর.আই.।

    • পেলভিসের সিটি স্ক্যান।

    • বুকের এক্স-রে বা সিটি স্ক্যান।

কোলন ক্যান্সার এর ধাপসমুহ ঃ

ক্যানসারটি কতটুকু বিস্তৃত হয়েছে তার উপরে ক্যান্সারের ধাপসমূহ নির্ভর করে। ধাপ নির্ধারণ করতে পারলেই যথাযথ চিকিৎসা প্রদান করা সম্ভব। সাধারণত ক্যানসারকে ১ থেকে ৪ পর্যন্ত ৪ টি ধাপে শ্রেণীভুক্ত করা হয়েছে।

স্টেজ-১: ক্যান্সার মলদ্বার বা কোলনের প্রাচীর পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু তা এখনও এর বাইরে প্রসারিত হয়নি।
স্টেজ-২: ক্যান্সার কোলন বা মলদ্বারের প্রাচীরের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছে, তবে এখনো নিকটবর্তী লিম্ফ নোডগুলিতে পৌঁছেনি।
স্টেজ-৩: ক্যান্সার নিকটবর্তী লিম্ফ নোডের উপর আক্রমণ করেছে, তবে শরীরের অন্যান্য অংশের উপর প্রভাব ফেলেনি।
স্টেজ-৪: ক্যান্সার দেহের অন্যান্য অঙ্গ যেমন- লিভার, ফুসফুস ইত্যাদি অংশে ছড়িয়ে পড়েছে।

কোলন ক্যান্সারের চিকিৎসা

কোলন ক্যান্সারের চিকিত্সা বিভিন্ন বিষয়ের উপর নির্ভর করে যেমন- আকার, অবস্থান, ক্যান্সারের স্তর, রোগ পুনরাবৃত্তিমূলক কিনা এবং বর্তমান রোগীর স্বাস্থ্যের সামগ্রিক অবস্থা। চিকিত্সাগুলো হলঃ কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি এবং অস্ত্রোপচার।

অস্ত্রোপচার: এটি সবচেয়ে সাধারণ (কমন) চিকিত্সা। ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি কমাতে ক্ষতিগ্রস্ত টিউমার এবং যেকোনো নিকটবর্তী লিম্ফ নোড অপসারণ করা। অন্ত্র অপসারণের পর বাকি অংশ সাধারণত একসঙ্গে জোড়া দেয়া হয়, কিন্তু কখনও কখনও মলদ্বার সম্পূর্ণ অপসারণ করা হয় এবং একটি কোলোস্টোমি ব্যাগ মল নিষ্কাশনের জন্য সংযুক্ত করা হয়। কোলোস্টোমি সাধারণত একটি অস্থায়ী প্রক্রিয়া, তবে অন্ত্রের প্রান্ত যোগদান করানো সম্ভব না হলে এটি স্থায়ী হতে পারে। ক্যান্সার যত শীঘ্র নির্ণিত হবে, সার্জারি তত সফলভাবে এটি অপসারণ করতে পারবে।

কেমোথেরাপি: কেমোথেরাপি হল ঔষধ যা ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করার জন্য ব্যবহার করা হয়। এটি সাধারণত কোলন ক্যান্সার অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণের পর ব্যবহৃত হয়। তবে অস্ত্রোপচারের আগে এটি টিউমারকে সঙ্কুচিত করতে সহায়তা করে।

রেডিও থেরাপি: কোলন ক্যান্সারে রেডিও থেরাপির তেমন ভূমিকা নেই। টিউমার সঙ্কুচিত করার প্রচেষ্টায় সার্জারীর আগে এটি ব্যবহার করা যেতে পারে এবং পুনরাবৃত্তিমূলক ক্যানসারে ব্যবহার করা হয়।

কোলন ক্যান্সার প্রতিরোধ 

নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাত্রা কোলোরেক্টাল ক্যানসার হওয়ার ঝুকি কমাতে পারে।

  • নিয়মিত স্ক্রিনিং: যাদের পূর্বে কোলোরেক্টাল ক্যানসার ছিল বা যাদের বয়স ৫০ এর উর্ধে বা যাদের এই ক্যানসার হওয়ার পারিবারিক ইতিহাস আছে তাদের অবশ্য নিয়মিত স্ক্রিনিং করা প্রয়োজন।

  • খাদ্য: প্রচুর পরিমাণে আশযুক্ত খাবার, ফল, সবজি খেতে হবে। লাল ও প্রক্রিয়াজাত মাংস থেকে বিরত থাকতে হবে। স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিবর্তে ভাল মানের ফ্যাট, যেমন আভাকাডো, অলিভ অয়েল, মাছের তেল এবং বাদাম ইত্যাদি খেতে হবে।

  • ব্যায়াম: পরিমিত এবং নিয়মিত ব্যায়াম কোলোরেক্টাল ক্যানসার এর ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে।

  • শারীরিক ওজন: বেশি ওজনের কারণে কোলরেক্টাল ক্যান্সার সহ অনেক ক্যান্সারের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

  • মদ্যপান ও ধূমপান থেকে বিরত থাকা।

পৃথিবীতে বর্তমানে ক্যান্সার মানুষের মৃত্যুর অন্যতম বড় একটি কারণ। তাই জীবন বাঁচাতে নিজেও সচেতন হন এবং অন্যকেও সচেতন করুন।