নতুন সম্ভাবনায় এলো ১৪২৬

নতুন সম্ভাবনায় এলো ১৪২৬

নিউজডেস্ক২৪: সময়ের লীলাখেলায় কালের অতল গহ্বরে বিলীন হলো আরেকটি বছর। আরেকটি বঙ্গাব্দ। এলো নতুন বছর ১৪২৬। শুভ নববর্ষ। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে দেশবাসী ও প্রবাসী বাঙালিদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পৃথক বাণীতে গতকাল শনিবার তারা নতুন বছরে সবার সুখ সমৃদ্ধি শান্তি ও কল্যাণ কামনা করেন।

অন্যদিকে বাংলা বর্ষকে বরণ করতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন আয়োজন করেছে নানা অনুষ্ঠানমালা। প্রকৃতপক্ষে, অতীতের হাত ধরেই আগমন ঘটে নতুনের। দিন, মাস, বছরের হিসেবেও তা-ই। জরা শেষে প্রকৃতি জেগে ওঠে পত্রপল্লবে। নতুন দিন, নতুন উদ্ভাস, নতুন সুর। প্রকৃতিজুড়ে নবতর সাজ। নতুনের আবাহনে প্রকাশ হতে থাকে পুরনো সব।

তা যেন হারিয়ে যায় না, ক্ষয়ে যায় না। ধিকি ধিকি করে জ্বলে। সেই প্রজ্বলিত দীপশিখায় পথ খোঁজা যায়। সরল রেখাপথ নির্ণয় করা যায়। বক্রপথ চিনে রাখা যায়। বুঝি কালের ধর্মই এটা। বছরের প্রথম দিন তাই আসুক সব অন্ধতা, পঙ্কিলতা, পাপাত্মা, মায়াজাল ছিন্ন করে। ‘...রসের আবেশরাশি শুষ্ক করি দাও আসি,/আনো আনো আনো তব প্রলয়ের শাঁখ/মায়ার কুজ্ঝটিজাল যাক দূরে যাক’Ñ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই যে আহ্বান, এই নতুন দিনে, নতুন বছরের প্রতিটি দিন সেই শুদ্ধতা পাকÑ এ চাওয়া সবার।

বাংলা নববর্ষ বাঙালির আবহমানকালের সর্বজনীন ও অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক উৎসব। এই উৎসবের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে বাঙালির আত্মপরিচয়, জাতীয়তাবাদের উত্থান এবং জাতিসত্তা ও সংস্কৃতির বিকাশ। এর মধ্য দিয়েই বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা বছরের পর বছর ধরে ঋদ্ধ হচ্ছে। তাই পহেলা বৈশাখ উদযাপন বা বাংলা বর্ষবরণ কেবল আনুষ্ঠানিকতানির্ভর কোনো উৎসব নয়; এই দিনটি বাঙালির ধর্মনিরপেক্ষতা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও শেকড় সন্ধানের পরিচয়ও বহন করে।

এই শেকড়ের গোড়াপত্তন আজকের নয়। বহুকাল আগেই এই দেশের মূলে তা প্রথিত হয়েছে। নববর্ষ-উদ্যাপন এখন বাংলাদেশের প্রধানতম উৎসব। এর মধ্যে আমরা খুঁজে পাই আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য, আমাদের স্বকীয়তা; আমাদের অস্তিত্বের শিকড়ও। কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় তৎকালে হয়তো খাজনা আদায়ের স্বার্থে ফসলি সন প্রবর্তনের প্রয়োজন ছিল।

অর্থনৈতিক স্বার্থের ব্যাপারটা এখানে মুখ্য হলেও সুপ্রাচীনকাল থেকে এদেশীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বিষয়টি গৌণ করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই জাতি বারবার বিদেশি শক্তির দ্বারা শাসনের নামে শোষিত ও নিগৃহীত হয়েছে। রাজনীতির পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং উৎসব পালনেও নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়েছে এই জাতিকে।

বিভিন্ন সময় বাঙালির সংস্কৃতি ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে আঘাত করা হয়েছে। তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত করতে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে ভিনদেশি সংস্কৃতি। কিন্তু বাঙালি তা কখনো মেনে নেয়নি। বাঙালি তার আপন সত্তায় বলীয়ান হয়ে ঐতিহ্য ও আদর্শ ধরে রেখেছে। এক থেকেছে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে। এরই ধারাবাহিকতায় আমরা যেমন মাতৃভাষা রক্ষা করতে পেরেছি, একইভাবে স্বাধীন করতে পেরেছি বাংলাদেশ।

মূলত ভাষা আন্দোলনের পর ধর্মভিত্তিক পাকি শাসনের ভিত্তিমূলে কুঠারাঘাত করা হয় বর্ষবরণের মধ্য দিয়ে। গত শতাব্দীর ষাটের দশকে ছায়ানটের আয়োজনে রমনার বটমূলে বর্ষবরণের এ উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানি গোষ্ঠীর পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রসাহিত্য ও সংগীতচর্চা বন্ধের চক্রান্তের প্রতিবাদে। শাসকশ্রেণি বিবেচনা করত পূর্ব পাকিস্তান কেবল মুসলামানদের ভূখ-।

এ কারণে বাংলা বর্ষবরণ বা পহেলা বৈশাখ পালন তারা ‘হিন্দুয়ানি সংস্কৃতি’ হিসেবে প্রচার করত। সর্বজনীন পহেলা বৈশাখ তারা ‘সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতি’ আখ্যা দিয়ে বাংলার অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধ্বংস করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল। এরই ধারাবাহিকতায় তারা একসময় পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রসংগীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। বাঙালিরা সেই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে জাতীয়তাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে আয়োজন করতে থাকে বৈশাখী অনুষ্ঠানমালা, যা আজ প্রত্যেক বাঙালির সবচেয়ে বড় উৎসব বলে পরিগণিত হয়ে থাকে। শুধু তা-ই নয়, নববর্ষ উপলক্ষে ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রচলিত আছে হালখাতার।

ধুমধাম খেয়েদেয়ে, পুরনো লেনদেন চুকিয়ে দিয়ে ক্রেতা এদিন বিক্রেতার প্রতিষ্ঠানে নতুন করে নাম তুলে দেন বাকিতে লেনদেনের। এ যেন অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক শাশ্বত মেলবন্ধন। সাম্প্রদায়িক, স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাবসহ সব অশুভ চেতনা বিনাশে এবং শুভ নব চেতনা উদয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানকে দিয়েছে নতুন এক মাত্রা। ‘...বাতাসে ঝিঁঝির গন্ধÑ বৈশাখের প্রান্তরের সবুজ বাতাসে;/নীলাভ নোনার বুকে ঘনরস গাঢ় আকাক্সক্ষায় নেমে আসে’ বলে জীবনানন্দ দাশ তার কবিতায় যে ছবি এঁকেছিলেন বহুকাল আগে এবং কাজী নজরুল ইসলামের যে আহ্বানÑ ‘তোরা সব জয়ধ্বনি র্ক/তোরা সব জয়ধ্বনি র্ক!!/ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কাল-বোশেখীর ঝড়।/তোরা সব জয়ধ্বনি র্ক!/তোরা সব জয়ধ্বনি র্ক!!’, তা যেন প্রত্যেক তরুণের ভেতরে, প্রত্যেক বাঙালির হৃদয়ে অসাম্প্রয়িক চেতনায় জাগরূক থাকে। তবেই সাম্প্রদায়িক, স্বৈরতান্ত্রিক মনোভাব, সব ঝড়, সব অপশক্তি বিনাশ হয়ে সবাই উপভোগ করতে পারবে নবতর সৃষ্টির উল্লাস। বাংলা বর্ষকে বরণ করতে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন আয়োজন করেছে নানা অনুষ্ঠানমালা।

প্রথম প্রহরে সকাল সোয়া ছয়টায় বাঁশিতে ভোরের রাগালাপ দিয়ে শুরু হবে বর্ষবরণের এই প্রভাতী আয়োজন। ছায়ানটের অনুষ্ঠানে থাকবে একক গান, সম্মেলক গান ও আবৃত্তি। প্রভাতী এ আয়োজন দেড় শতাধিক শিল্পী অংশ নেবেন। সকাল সোয়া ছয়টায় শুরু হয়ে সোয়া দুই ঘণ্টার ব্যাপ্তিকালের এ আয়োজন শেষ হবে সকাল সাড়ে ৮টায়। অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করবে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার।

আয়োজন শেষে সংগীত পরিবেশন করেন ছায়ানটের শিল্পীরা। চারুকলার উদ্যোগে এবারও মঙ্গল শোভাযাত্রা বের হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) চারুকলা অনুষদ থেকে। ১৯৮৯ সাল থেকে শুরু হওয়া এ শোভাযাত্রা নববর্ষ উদযাপন সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের নেতৃত্বে এ শোভাযাত্রায় অংশ নেবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ হাজারো বাঙালি। শোভাযাত্রাটি চারুকলা থেকে বের হয়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল (সাবেক রূপসী বাংলা) হয়ে পুনরায় চারুকলায় এসে শেষ হবে।

২০১৬ সালে ‘ইউনেস্কোর কালচারাল হেরিটেজ’-এর স্বীকৃতি অর্জনের পর এই মঙ্গল শোভাযাত্রাটি বাঙালির অহঙ্কার ও গৌরবের একটি স্থানে উন্নীত হয়েছে। বাংলা একাডেমি সকালে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। দিবসটি উপলক্ষে বইমেলাসহ বৈশাখী মেলার আয়োজন করেছে একাডেমি চত্বরে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান আয়োজন করেছে। সকাল ৮টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান মুক্তমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে লাঠিখেলা, অ্যাক্রোবেটিক প্রদর্শনী, সংগীত ও নৃত্য পরিবেশনা এবং বিকাল ৩টায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে হাডুডু খেলা, লাঠিখেলা, অ্যাক্রোবেটিক প্রদর্শনী, সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি ও লোকনাট্য পরিবেশনা।

চ্যানেল আই-সুরের ধারায় ভোরে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার নেতৃত্বে সারাদেশ থেকে নির্বাচিত হাজারো শিল্পীর কণ্ঠে পরিবেশিত হবে বর্ষবরণের গান। এবার ভুটানের প্রধানমন্ত্রী লোটে শেরিং সস্ত্রীক এ উৎসবে যোগ দেবেন। অনুষ্ঠানে সংগীত, নাটক ও আলোচনায় অংশ নেবেন বাংলাদেশ ও কলকাতা থেকে আগত বিশিষ্টজনরা। অনুষ্ঠানস্থলে থাকবে বাঙালির হাজার বছরের বিভিন্ন ঐতিহ্যের উপাদান দিয়ে সাজানো বৈশাখী মেলার হরেক রকম স্টল। স্টলগুলোয় শোভা পাবে পিঠাপুলি, মাটির তৈরি তৈজস, বেত, কাঁথা, পিতল, পাট-পাটজাত দ্রব্যের জিনিসপত্রসহ রকমারি ও ঐতিহ্যসমৃদ্ধ নানা পণ্যসামগ্রী। উৎসব চলবে দুপুর ২টা পর্যন্ত। অনুষ্ঠানটি সরাসরি সম্প্রচার করবে চ্যানেল আই ।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আয়োজনে ধানম-ি রবীন্দ্রসরোবর মঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে সম্মিলিত পহেলা বৈশাখের বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা। বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চলবে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। সকাল নয়টায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে নৃত্য পরিবেশন করবে নৃত্যজন ও সংগীতাঙ্গন মণিপুর। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করবে কল্পরেখা, ইউসেপ স্কুল, আগারগাঁও আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় ও বধ্যভূমির সন্তানদল এবং বাউল গান পরিবেশন করবে রঞ্জিত দাস বাউল ও মমতা দাসী। বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের আয়োজনে থাকছে ‘পরান ভরি দাও’ গানের আসর।

লালমাটিয়ার বেঙ্গল বইঘরের এই অনুষ্ঠানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকবে পথিক বাউলের বাঁশি ও গান। ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠী সকাল ১০টায় শিশুপার্কের নারিকেল বীথি চত্বরে অনুষ্ঠান করবে। জাতীয় প্রেসক্লাব : বর্ষবরণ উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাব আয়োজন করেছে বিভিন্ন অনুষ্ঠান। ক্লাব সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে থাকছে খৈ, মুড়ি, মুড়কি, পান্তাসহ নানা ধরনের খাওয়া আর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

ডিআরইউ : ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) প্রাঙ্গণে নববর্ষের আয়োজন শুরু হবে সকাল সাড়ে ৮টায়। চলবে বিকাল ৪টা পর্যন্ত।  সকাল দশটায় কচি-কাঁচা প্রাঙ্গণে এবং মিলনায়তনে কচি-কাঁচার মেলার শিশু-কিশোর, তরুণ-প্রবীণ সদস্যদের অংশগ্রহণে আলোচনাচক্র, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পিঠামেলার আয়োজন করা হয়েছে।  বৈশাখী মেলার আয়োজন করেছে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলাপ্রাঙ্গণে।