নারী-পুরুষ বৈষম্য নয়, আগে মানুষ হওয়াটা জরুরী

নারী-পুরুষ বৈষম্য নয়, আগে মানুষ হওয়াটা জরুরী

নিউজডেস্ক২৪: বর্তমান পৃথিবীতে ক্ষমতা আর টাকার কাছে নারী-পুরুষের আসল চেহারা সমান। একজন নারীর উন্নয়নে অনেক পুরুষের অবদান থাকে। পুরুষ থেকে আলাদা করে নারীকে চিন্তা করতে শিখিয়ে কোনদিন সুস্থ-শৃঙ্খল পৃথিবী হবে না।

শুধু কি নারীরাই অসহায়? সমাজে অনেক পুরুষ আছে অবহেলিত, নিগৃহীত আর অসহায়, কুচক্রী নারীর কবলে পড়ে যাদের জীবন এলোমেলো। অফিস-আদালতে, কাগজে-কলমে, দেশে-বিদেশে আর ইতিহাসে নারীরা অসহায়। কিংবা তাদের প্রতি সমাজের সহানুভূতির ইমেজ সব জায়গায় প্রচলিত আছে।

অথচ পৃথিবীতে যতো অন্যায় কাজের ইতিহাস আছে তার অনেক কিছুর পেছনেই পুরুষের সাথে সাথে নারীরাও সম্পৃক্ত। আবার পৃথিবীর অনেক অনেক মহৎ কাজেও পুরুষের সাথে নারীরা আছে। সুতরাং নারী দিবস পালন করে নারীকে আলাদা করার কোন মানে নেই। এই পৃথিবীর সুন্দর মানব সভ্যতা রক্ষা করতে নারী এবং পুরুষকে মানবিক শিক্ষায় জ্ঞান অর্জন করতে হবে।

গতকাল একদল নরপশুর কবলে পড়ে স্কুল ছাত্রী লাঞ্ছনার খবরে ইউটিউব মিডিয়া রসগল্পে মুখরিত। মেয়েটি ফেসবুকে দেওয়া স্টাটাসে লিখেছে- “এই নরপশুদের দেশে থাকব না…”। তার মানে এই দেশটা কি নরপশুদের হাতে বন্দি হয়ে যাচ্ছে? বাংলাদেশে কি ভালো মানুষ নেই? অবশ্যই অনেক ভালো মানুষ আছে। আর আছে বলেই সাধারণ মানুষগুলো এইসব আচরণের প্রতিবাদও করছে।

অথচ পৃথিবীর সব দেশেই কিন্তু ধর্ষণ, টিজিং কম-বেশি আছে। পৃথিবীর সব দেশেই নিরাপত্তা ইস্যুতে নারীরা অবশ্যই অসহায়। তবে বাংলাদেশে ইদানিং এই ধরনের খবরগুলো প্রচুর শোনা যাচ্ছে। কারণ শাস্তি না হওয়ার কারণেই এই অপরাধগুলো দিনের পর দিন আমাদের চোখ-কান সহ্য করে যাচ্ছে।

বাংলাদেশটা খুব ভয়ংকর কিছু স্বার্থপর মানুষের চালবাজিতে চলছে। সব জায়গায় অমানবিক স্বার্থের খেলা। আর সেই খেলায় এখন নারী-পুরুষ উভয়ই জড়িত। অং সাং সুচি! তিনি কিছু দিন আগেও মমতাময়ী নারী ছিলেন। কতো শত মহৎ স্বীকৃতি পেয়েছেন।

এখন হাজার হাজার অসহায় রোহিঙ্গা নিধনে তিনি নারী নামের এক কলঙ্ক! সময় তাকে ‘রাক্ষসী’ হিসেবেই চিনবে। ইতিহাস রাক্ষসী নারী হিসেবেই জানবে। তদ্রুপ আজকাল ক্ষমতার আর স্বার্থের কারণে নারীরা কতো ধরনের যে প্রোপাগান্ডা চালায় বা চালাতে পারে তা কেবল তারাই জানে যাদের অভিজ্ঞতা আছে। মানুষ মাত্রই ভালো এবং মন্দ। তেমনি নারীরাও মানুষ। নারীদের মধ্যেও ভাল এবং মন্দ থাকবে।

আমি আমার পূর্বের কোন এক কর্মস্থলের এক নারীর গল্প বলি। তিনি নিজেই নিজের স্বামীকে ত্যাগ করেছেন। তার নিজের কিছু খারাপ স্বভাবের কারণে। অথচ বাইরের সমাজে নিজেকে সে ধার্মিক এবং স্বামীর জন্য তার ন্যাকা আবেগ শো অফ করতো। অফিসের বেশিরভাগ পুরুষকে তিনি তার কবজায় রাখতেন।

পুরুষগুলো তার নোংরা ক্ষমতার কাছে অসহায় থাকতো। আর সব সময় দীর্ঘশ্বাস ফেলতো ও অভিশাপ দিতো। আর নারীরা পড়তো তার বিষাক্ত হিংসার রোষানলে। যে মানুষ হিসেবেই ছিল স্বার্থপর, উচ্চাভিলাসী আর ক্ষমতা পাগল স্বেচ্ছাচারী। নারীর স্বভাব- সহজাত ভালোবাসা তার মধ্যে ছিল না। সে-ও নারী হিসেবেই জন্মেছে। ছদ্মবেশী নারী পুরুষ তো আর কম দেখলাম না।

পরিচিত আরেকটা কাহিনী বলি। এক পরহেজগার মহিলা ইঞ্জিনিয়ার রোজার দিনে ঘুষ হাত দিয়ে নিবে না বলে সবাইকে ড্রয়ার খুলে দিত …। এমন শত শত বাস্তব গল্প আছে। যেখানে একদিকে নারী মহীয়সী অন্য দিকে নারী ‘রাক্ষসী’।

এবার অন্য প্রসঙ্গে বলি। বোরকা পড়লেই যেমন ধার্মিক হয় না, তেমনি স্লিভলেস ব্লাউজ আর কপালে বড় টিপ দিলেই কেউ সত্যিকারের সুশীল হয় না। কিছু মহিলা পারলে কাপরহীন সুশীলতার কার্ড ধারণ করে, যা ভীষণ অরুচিকর। দিনে দিনে মানুষের ভেতর থেকে শালীনতার চর্চা, সভ্যতার চর্চা আর মানবিকতার চর্চা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাই মনের কুপ্রবৃত্তিগুলোই বেশি নাড়াচাড়া দেয়।

মানুষের জীবন সংস্কৃতি, জীবন-যাপন পদ্ধতি নানা রকম নোংরামিতে ভরে যাচ্ছে। আজকাল টিভি নাটক, সিনেমা কিংবা সংস্কৃতি অঙ্গনের কিছু মানুষকে দেখলে মনে হয় আমরা পরিমিতি বোধের জায়গা থেকে অনেক দূরে সরে যাচ্ছি। গল্পের চেয়ে গ্লামার কিংবা খোলামেলা পোশাকের নায়ক-নায়িকা দেখতেই হয়তো সবাই বিনোদন জগতে চোখ রাখে।

পোশাকের স্বাধীনতা এবং জীবন-যাপনের স্বাধীনতা সবার আছে। অন্য দেশের সংস্কৃতি অনুসরণ করতে গিয়ে আমরা যে কখনও কি কি করি আমরা নিজেরাও জানি না। মহান সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কেউ এর ব্যাখ্যা দিতে পারবে না। পোশাক মানুষের মনের অভিরুচি সভ্যতা প্রকাশ করে। যারা নিজেদের উন্মোচিত রাখতে ভালোবাসে তাদের মনে সভ্যতার ঘাটতি আছে।

কারণ, এক সময় অসভ্য জাতিরাই কাপড়বিহীন থাকতো। অথচ দেখুন বেগম রোকেয়া এবং মাদার তেরেসা- এরা কিন্তু কেউ এমন কপালে বড় টিপ বা স্লিভলেস ব্লাউজ পড়েনি কিংবা বর্তমান সুশীলদের মতো ডাবল স্ট্যান্ডার্ড মানসিকতা ধারণ করতো না। সময়ের পর সময় ধরে তাদের চিন্তা-চেতনা ও মানবিক বোধগুলো কিন্তু ঠিকই মানুষ হৃদয়ে ধারণ করে আছে।

বর্তমানে কিছু নারী মডেল এবং নায়িকা প্রকাশ্যে তারা যে ছোটবেলা থেকে খোলামেলা থেকেই বা কাপড়বিহীন বড় হয়েছে তা নিয়ে গর্ব করে স্টেটমেন্ট দেয়। কি অদ্ভূত নোংরামির মানসিকতার মেসেজ আমরা সুশীল বা ভদ্র সমাজ থেকে পাই! যাদের কিনা সাধারণ মানুষ অনুসরণ করে। আবার অনেকে বোরকা পড়ে ঠিক, কিন্তু লজ্জা মনে হয় সব মাথায় থাকে। একশ কেজি কাপড় মাথায় জড়িয়ে রাখে। আর শরীরের অন্য স্থানগুলো, সেনসেটিভ জায়গাগুলো দিব্যি উন্মুক্ত রেখে চলে!

শালীনতা আর ভদ্রতা সভ্য-সুস্থ মানুষের পরিচায়ক। সব ধর্মের বা ধর্মবিহীন মানুষের কাছে ভদ্রতা বা শালীনতার ব্যখ্যা প্রায় এক। এখন এই পৃথিবী অনেক বেশি মিশ্র। তবুও নারী পুরুষের জীবন যুদ্ধ আর বেঁচে থাকার গল্প কিন্তু মানচিত্র পেরিয়ে সব জায়গায় এক। নারী পুরুষের সভ্যতা আর ভদ্রতা সব দেশেই আছে।

আসুন, নারী ও পুরুষ শব্দ দুটোকে আলাদা না করে নিজের মনের পবিত্রতা, সততা আর ভালোবাসা দিয়ে পৃথিবীটাকে সুন্দর করি। একটি সুন্দর পৃথিবীর জন্য মানুষের ভালোবাসার জায়গাটা পরিস্কার করি। গোটা পৃথিবীটা কিন্তু মানব-মানবীর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক অভিন্ন পরিবার। এই পৃথিবী নামক পরিবারকে ভালবাসতে হবে। তবেই পৃথিবী আপনাকে সুন্দর সুন্দর উছিলা উপকরণে ভালো রাখব। আমরা নারী কিংবা পুরুষ হওয়ার আগে মানুষ হই।

লেখক: নুরুন নাহার লিলিয়ান