জেনে নিন খুলনা জেলার সব দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে

জেনে নিন খুলনা জেলার সব দর্শনীয় স্থান সম্পর্কে

নিউজডেস্ক২৪: বাংলাদেশের চতুর্থ বৃহত্তম বিভাগ। সর্ব দক্ষিণের বঙ্গোপসাগর আর বিখ্যাত সুন্দরবনের কোলে বেড়ে ওঠা স্থানের নাম খুলনা। পুরো খুলনা বিভাগের উল্লেখযোগ্য জেলাগুলো হচ্ছে খুলনা, যশোর, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, মংলা ইত্যাদি। পুরো খুলনা বিভাগ তো বটেই খুলনা জেলার দর্শনীয় স্থানও নিদেনপক্ষে কম নয়।

এখানে যেমন আছে মন প্রশান্তকারী নদী তেমনি রয়েছে পুরনো জমিদারবাড়ি। খুলনা জেলা যদিও পর্যটনের জন্য বিখ্যাত নয় তবুও এই জেলায় কয়েকদিনের জন্য বেড়াতে আসা যায় নির্দ্বিধায়। বেড়াতে আসার আগে দেখে নিতে হবে খুলনার কোথায় কী আছে। আমাদের আজকের এই লেখা খুলনার সেসব দর্শনীয় স্থান নিয়ে যা আপনার খুলনা ভ্রমণকে করবে আরো প্রাঞ্জল এবং সুন্দর।

১. রবীন্দ্রনাথের শ্বশুড়বাড়ি

আরও পড়ুনঃ তিনাপ সাইতার বাংলাদেশের বৃহত্তম জলপ্রপাত

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ-পত্নীর আদি-ভিটা এই খুলনাতে। খুলনার ফুলতলায় অবস্থিত রবীন্দ্রনাথের শ্বশুড়বাড়ি খুলনার ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার মধ্যে একটি। শহর থেকে মাহিন্দ্রতে (ইঞ্জিন চালিত গাড়ি) করে আসা যায় ফুলতলায়। ভাড়া নেবে ৪০ টাকা।

সেখান থেকে যেকোনো অটোকে বললেই নিয়ে যাবে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুড়বাড়িতে। এখানে আসার রাস্তাটাও বেশ সুন্দর। গাছপালায় ঘেরা গ্রামের কাঁচা-পাকা রাস্তার স্বাদ পাওয়া যাবে আসার সময়। সরকার কর্তৃক সংরক্ষিত এই বাড়িখানা বন্ধ থাকে ছুটির দিনগুলোতে। জমিদার বাড়ির আদলে গড়া এই বাড়িখানাতে আছে বেশ কয়েকটি সবুজ জানালা আর বড় বড় পিলার। মোট আয়তন কম হলেও ঘুরতে আসার একটি উত্তম জায়গা এটি।

২. খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশের সেরা দর্শনীয় স্থানগুলো সম্পর্কে!

শহর থেকে কাছে কোনো নিরিবিলি জায়গায় বসে আড্ডা-গানে মেতে উঠতে কিংবা প্রিয়জন নিয়ে ঘুরে বেড়াতে চলে আসা যায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে। খুলনার গল্লামারী পর্যন্ত মাহিন্দ্রতে এসে তারপর হেঁটেই যাওয়া যায় এই বিশ্ববিদ্যালয়ে অথবা সরাসরি অটো নিয়ে চলে আসা যায় এর মূল ফটকে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে অদম্য বাংলা, শহীদ মিনার, কেন্দ্রীয় মাঠ, ছোটবড় প্রচুর টং দোকান আর বিভাগীয় ভবন, শিক্ষার্থীদের আবাসন হল। তবে সাধারণ যেকোনো দিনের চেয়ে হাজার গুণে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সুন্দর দেখায় নববর্ষের দিন। খুব ঘটা করে পালন করা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নববর্ষ উদযাপন করতে প্রচুর মানুষের সমাগম হয় সেদিন। ক্যাম্পাসে বসে নানা রকম বাঙালি স্টল আর পরিবেশিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

৩. রূপসা

কেউ যদি খুলনা এসে বায়না ধরে নৌকায় চড়ে নদীতে ঘুরে বেড়াবে, তবে তার জন্য অপেক্ষা করে আছে খুলনার ‘রুপসী’ রূপসা নদী। আবার কেউ যদি খুলনায় সোডিয়াম বাতির নিচে একটি সুন্দর সন্ধ্যা কাটানোর ইচ্ছে পোষণ করে, তবে রূপসা নদীর উপরেই আছে রূপসা ব্রীজ।

ভূমি থেকে ৩-৪ তলা উপরের এই ব্রীজ ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের অংশ। একদম ব্রীজের উপরে উঠে গেলে সেখান থেকে দেখা যায় পুরো খুলনার অসাধারণ ল্যান্ডস্কেপ। রাতে আর দিনে সে দৃশ্যের ধরণ একদমই আলাদা, দিনে যেটা কর্মব্যস্ত চিত্র রাতে সেটা মিটমিট করে জ্বলতে থাকা হাজারো আলোর সমারোহ। জিরো পয়েন্টের খুব কাছেই অবস্থিত রূপসা ব্রীজ। ব্রীজ থেকে নেমে পাড় থেকে নৌকা ভাড়া করা যায় ঘণ্টা হিসেবে। রাতের বেলায় সে নৌকা ভ্রমণের অপার্থিবতা বেশি অনুভব করা যায়।

৪. ভৈরব নদী

খুলনা শহর থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরের এলাকা ফুলবাড়ি। ফুলবাড়ি গেট থেকে বাজারের দিকে গেলেই অনেক ভ্যান পাওয়া যায় ভৈরব যাওয়ার। খুলনায় একটি ছিমছাম বিকেল কাটানো যায় ভৈরব নদীর পাড়ে। কাঠের মিল আছে সেখানে, গেলেই দেখা যাবে প্রচুর গাছের গুড়ি ফেলে রাখা আছে নদীর পাড়ে।

সেই গাছের গুড়ির উপর বসে ভৈরব নদীর মৃদুমন্দ বাতাস উপভোগ করা নিঃসন্দেহে সুন্দর একটা বিকেল কাটানোর জন্য যথেষ্ট। ভৈরবে নৌকা ভাড়া করে ঘুরে আসা যাবে দেড়-দুই ঘণ্টার জন্য। ভাড়া রাখবে ৫০-৬০ টাকা। খুবই কম খরচে বন্ধু-বান্ধব নিয়ে করা যায় নৌকাভ্রমণ।

ভৈরবের অপর পাড়ে নৌকা নিয়ে যাওয়া যায়। অপর পাড়ে একটি মন্দির আছে যেখানে প্রতি সোমবারে কীর্তনের আয়োজন করা হয়। যদিও এটা হিন্দুদের একটি নৈমিত্তিক অনুষ্ঠান, তবে যে কেউ যোগ দিতে পারবে এখানে । অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনা নিয়ে বাংলার এই ঐতিহ্য উপভোগ করা যাবে প্রতি সোমবার ভৈরবের অপর পাড়ে।

৫. বিশ্বরোড বাইপাস রংপুর গ্রাম

ফুলবাড়ি গেট থেকে অটো নিয়ে যেকোনো বিকেলে চলে আসা যায় বিশ্বরোড বাইপাসে। রাস্তার চারিদিকে গাছপালা দিয়ে ঘেরা বেশ সুন্দর জায়গা এটি। রাস্তার ধার ধরে বিকালের হাঁটাটাও হেঁটে নেয়া যাবে বাইপাসে।

সবচেয়ে বেশি ভালো লাগবে যে বিষয়টা, এখানে লোকালয় একটু কম বলে রাস্তাটা প্রচুর পরিষ্কার আর নতুন। বাইপাসে গিয়ে হাতের ডানদিকে সামনে এগোতে থাকলে ছোট মতন কালভার্ট পড়বে। সেই কালভার্ট পার হলেই আপনি প্রবেশ করবেন খুলনার রংপুর গ্রামে। খুব সাধারণ এই গ্রামে চাষ হয় তামাক আর পানপাতা। পাকা রাস্তা ধরে এগোতে থাকলে গ্রামের সবুজে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করবে যে কারো। পায়ে হেঁটেই দেখা যাবে পুরো গ্রাম। শহুরে জীবন থেকে মুক্তি পেতে চলে আসা যায় এই গ্রামে।

৬. জাহানাবাদ ক্যান্টনমেন্ট

পরিবার পরিজন নিয়ে কোনো প্রাকৃতিক পার্কে যেতে চাইলে খুলনার অদূরে আছে জাহানাবাদ ক্যান্টনমেন্ট। ক্যান্টনমেন্টগুলো এমনিতেই সুন্দর হয়, তার উপর এই ক্যান্টনমেন্টের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে জাহানাবাদ পার্ক। জাহানাবাদ পার্ক সাধারণ পার্কের চেয়ে একটু আলাদা।

বিশাল এলাকা জুড়ে গড়ে তোলা এই পার্কে আছে চিড়িয়াখানা, দু-তিনটে পুকুর আর গাছের সবুজতায় ঘেরা বসার প্রচুর জায়গা। এই পার্কের প্রবেশমূল্য ৩০ টাকা। বেশ সমৃদ্ধ এখানকার চিড়িয়াখানাটি। বাংলার রয়েল বেঙ্গল টাইগার, সারস পাখি, অজগর, বিভিন্ন প্রজাতির প্রচুর পাখি, বানর, হনুমান, কুমির- কী নেই এখানে! পুরো পার্কটা ঘুরে আসতে বেশ সময় লেগে যাবে। ভেতরে খাবার-দাবারের ব্যবস্থাও আছে। ছুটির দিনে জাহানাবাদ পার্ক পরিবারের সবাইকে নিয়ে পিকনিক করার মতো জায়গা বটে ।

৭. এগারো শিব মন্দির

খুলনার অদূরে রাজঘাটে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন এগারোটি শিব মন্দির। রাজঘাটে যেতে হলে উঠতে হবে গড়াই বাসে, বলতে হবে নোয়াপাড়া যাবো। পথে নেমে যেতে হবে রাজঘাটে। ভাড়া নেবে ফুলবাড়ি গেট থেকে ১৫ টাকা। মাঝে ভৈরব নদী পার হতে হবে।

ওপার থেকে ভ্যান নিতে হবে। ভ্যান এগারো শিব মন্দিরে নিয়ে যাবে দুই পথে। একটা পথ একটু ঘুরে যায় আরেকটি ভেতর দিয়ে যায়। প্রথম পথে ভাড়া ১০ টাকা আর ভেতর দিয়ে নিয়ে গেলে ভাড়া ৫ টাকা। দুটো রাস্তাই বেশ সুন্দর, উপভোগ করার মতো।

এগারো শিব মন্দিরের সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হলো, এখানকার ১১টি শিব মন্দিরের ১০টিতেই কোনো শিব মূর্তি নেই আর বাকি একটি মন্দির বহু আগে থেকেই তালাবন্ধ করা আছে। ধারণা করা হয়, সেই একটি মন্দিরেই আছে শিব মূর্তি। মন্দিরটির কথা খুব বেশি মানুষ না জানলেও দেখার মতো স্থান এটি খুলনা জেলার মধ্যে।