বাবার দ্বিতীয় বিয়ে ও আমার কষ্ট...

বাবার দ্বিতীয় বিয়ে ও আমার কষ্ট...

নিউজডেস্ক২৪: বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। বিয়ের কাজটা সেরেছেন খুবই গোপনে। আমি বা আমার মা কেউই ব্যাপারটা জানতাম না। মায়ের আগেই আমি জানতে পারলাম। কলেজ থেকে ফেরার পথে আব্বার এক কলিগের সাথে দেখা হয়ে গেল। সগীর হোসেন নামের সেই মানুষটা আমাকে দেখে চোখে মুখে উচ্ছ্বাস দেখালেন। তাঁর সাথে আগেও আমার দেখা হয়েছে, এমস উচ্ছ্বাস কখনো দেখাননি। সালাম দিতাম, সালামের জবাব দিতেন, এই শেষ। এবার দেখা হওয়ামাত্র আমার হাত ধরে টেনে রাস্তার পাশে একটা বড় গাছের তলায় নিয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বললেন, খোকা কেমন আছো?

আমি কিছুটা বিব্রত হয়ে বললাম, আমি ভালো আছি আংকেল। আপনি কেমন আছেন? কোনো সমস্যা হয়েছে?

তিনি ইতস্তত করে বললেন, না আমার কোনো সমস্যা হয়নি। তুমি কেমন আছো?
একই প্রশ্নের উত্তর দুইবার দেয়ার কোনো মানে নেই। আমি পাল্টা প্রশ্ন করে বললাম, আংকেল আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে কোনো সমস্যা। আপনি কি কিছু বলবেন?
সগীর হোসেন আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে বললেন, তোমার বয়স কত এখন খোকা?
- ১৯ বছর।
- তোমার মায়ের কী অবস্থা এখন?
- মায়ের অবস্থা আরো খারাপ হচ্ছে। ডায়ালাইসিস করার পরও ক্রিয়েটিনিন বেড়েই চলেছে।
- আই সি।

আমি বিরক্ত হয়ে যাচ্ছি। যেসব মানুষ কোনো দিন কোনো খবর রাখেনি সেসব মানুষজন হুট করে খবর নিতে গেলে আনন্দের চেয়ে আতংক লাগে বেশি। আমার তেমনই মনে হচ্ছে। আমি একটু মুচকি হেসে বললাম, আংকেল আমার চলে যেতে হবে। আপনি কিছু বললে বলতে পারেন।

সগীর হোসেন তার দাঁড়িতে একবার হাক বুলালেন। তারপর মুখ একটু করুণ করার ব্যর্থ চেষ্টা করে বললেন, তোমাকে কিছু কথা বলা উচিত মনে হচ্ছে। আবার একই সাথে বলা অনুচিত। তোমার ডাকনাম এখনো খোকা, ছোট মানুষ তুমি। অবশ্য একই সাথে তোমার বয়স ১৯ হয়ে গেছে। বয়সটা একেবারে কম না।
আমি বললাম, দেয়ালের দুইপাশে ধাক্কাধাক্কি না করে একপাশে ধাক্কা দিন। আর না হলে দেয়াল জীবনেও নড়বে না।

সগীর আংকেল নির্মল হাসি দিয়ে বললেন, খোকা তুমি আসলেই বড় হয়ে গেছ। কত সুন্দর কথাটা বললে! যাই হোক তোমার বাবার কোনো খোঁজ জানো?
- বাবা আজকে অফিসে গেছে। গতকাল বাসায় ছিল।
- তা না। গত মাসের শেষদিকে কি বাসায় ছিল?
- না। অফিসের একটা কাজে কুমিল্লা যেতে হয়েছে। এক সপ্তাহের ছুটি ছিল।
সগীর আংকেল মুখ দিয়ে চুকচুক করে বললেন, তোমার বাবাকে এত ভালো জানতাম, জানো? এরকম প্রতারণা করবে আশা করিনি। এত জঘন্য কাজ, এত নোংরা কাজ! আফসোস।

আমার বুক ধ্বক করে উঠল। বাবা কি তবে অফিসের টাকা নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন? কারো থেকে ঘুষ নিয়েছেন? আব্বা তো এমন মানুষ না। কোনোদিন এমন কাজ করতেও দেখিনি। ভাবাই যায় না। আমি বললাম, আংকেল আপনি কী বলতে চান ঠিক করে বলুন তো।

সগীর আংকেল আরেকবার তার কাঁচাপাকা দাঁড়িতে হাত বুলিয়ে বললেন, তোমার বাবা এই বয়সে এসে আরেকটা বিয়ে করেছে। ছি! ছি! ছি! এই যে তোমার মতো বাচ্চা ছেলেকে মিথ্যা বলল, এই যে তোমার অসুস্থ মায়ের সাথে প্রতারণা করল এটা কী ঠিক? এই বয়সে এসে? ছি!

আমার কয়েক সেকেন্ড ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম। এ কী করে সম্ভব! এ কী করে সম্ভব! কাঁপা কাঁপা গলায় বললাম, আপনি সত্যি বলছেন তো?

সগীর আংকেল তাঁর ফোন বের করলেন। ব্যস্ত হাতে ফোন চেপে কয়েকটা ছবি বের করলেন। ছবিতে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে আমার বাবার পাশে এক মহিলা বসা। বাবার মাথায় টুপি, মহিলার মাথা নিচু। বিয়ের আসরে এভাবেই বসতে হয়। মহিলার দিকে তাকানোর মতো রুচি আমার হলো না। আমি তাকালাম আমার বাবার ছবির দিকে। এই আমার মহাপুরুষ বাবা? এই আমার আইডল? ইনি আমাকে শিখিয়েছিলেন মিথ্যা বলা যাবে না, অন্যায় করা যাবে না। সারা জীবন ধরে আমার মা যাকে পূজা করেছেন এটা তার আসল রূপ!

আমি এক মুহূর্তের জন্য সগীর আংকেলের মুখের দিকে তাকালাম। তার মুখে চাপা হাসি। তিনি আমার হাত ধরে অভয় দিয়ে বললেন, বেশি চিন্তা কোরো না খোকা। মানুষ বদলে যায়। মানুষ জাতটাই এমন। তুমি শক্ত হও, নিজের মায়ের দিকে খেয়াল রেখো।
আমি ঘাড় নাড়লাম।
- কোনো সমস্যা হলে আপন মনে করে বলতে পারো। তোমার মায়ের জন্য অনেক খারাপ লাগছে। যাই হোক, হেঁটে হেঁটে বাসায় যাওয়ার দরকার নেই। একটা রিক্সা নিয়ে চলে যাও। রিক্সা ভাড়া লাগবে?
- লাগবে না।
- আরে লাগলে লজ্জা কিসের? আর শুনো, এসব তোমার বাবা বা মা কারো সাথেই আলোচনা করার দরকার নেই। আমি বলেছি বলারও দরকার নেই। দুর্গন্ধ যত চাপা থাকবে ততই লাভ।
- আচ্ছা।

আমি হাঁটা দিলাম। আমার কাছে মনে হচ্ছে হাঁটতে হাঁটতে পৃথিবীর সীমানা বরাবর পৌঁছে যাই। একটা জনমানবহীন পর্বতের চূড়ায় উঠে চিৎকার করে কান্না করি। সর্বশক্তি দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলি, হে খোদা! জগত এমন কেন? মানুষ এমন কেন? আমার মাকে মৃত্যুশয্যায় রেখে আমার আদর্শ বাবা আবার বিয়ে করল কীভাবে?
...
দুর্গন্ধ চাপা থাকেনি। আব্বার বিয়ের খবর ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগল না।
সন্ধ্যা রাত। বাবা তখনো অফিস থেকে ফেরেননি। কিছুদিন আগেও বাবার অফিস থেকে ফিরতে দেরি হলে টেনশন হতো। এখন টেনশন হয়না, ঘেন্না লাগে। বারবারই মনে হয় বাবা অন্য কোনো নারীর সাথে সময় কাটাচ্ছেন। বৃদ্ধ বয়সের একান্ত নিষিদ্ধ সময়।

আমি মায়ের বিছানার পাশে গিয়ে বসলাম। মায়ের উঠাচলার শক্তি দিনে দিনে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। দুইটা কিডনীই বিকল। মা ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছেন। তাঁর সাথে আমার এক পৃথিবী দেয়াল সৃষ্টি হয়ে যাবে যে কোনো মুহুর্তে। মানব জীবনের সবচেয়ে ভয়ানক অথচ বাস্তব এই সত্য আমি মানতে পারছি না আবার না মেনেও কিছু করার নেই। নিজের অজান্তেই মাঝে মাঝে ভাবি, মায়ের কবর গ্রামের গোরস্থানের কোন পাশে হবে? পুরো গোরস্থানের ছবি ভেসে ওঠে। আমি কি খুব কান্না করব? হুট করেই আমি প্রচণ্ড রকম অনুতাপে ভুগি। নিজের জীবিত মায়ের মৃত্যু নিয়ে এরকম ভাবতে পারছি কীভাবে? আমার তখুনি কান্না পায়।

মা আমার একটা হাত ধরে বললেন, খোকা! কেমন আছিস তুই?
আমি মাথা নিচু করে বসে থাকলাম। আমি কেমন আছি এটা কী করে বলি?
মা বললেন, তোর মুখ দেখে কদিন ধরে মনে হচ্ছে তুই কিছু লুকাচ্ছিস। কী লুকাচ্ছিস?
আমি বললাম, কিছু না।
- কিছু তো অবশ্যই। বলে ফেল।
আমি নিজের ভেতরের ভার আর নিতে পারছিলাম না। মায়ের থেকে এই অসম্ভব সত্য আর লুকানো সম্ভব হচ্ছিল না। আমি তাঁর বুকে মাথা রেখে ঝরঝর করে কাঁদতে কাঁদতে বললাম, মা! বাবা আবার বিয়ে করে ফেলেছে!

মা আমাকে তাঁর বুকের সাথে চেপে ধরলেন। মিনিটখানেক পর আমার কান্না যখন থেমে গেছে তখন আমাকে দুর্বল হাতে টেনে তুলে মিষ্টি করে হেসে বললেন, এই খবর তো আমি জানিরে।
আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, এই খবর তুমি কবে থেকে জানো? বাবা বলেছে?
- না। আমি যে জানি এটা তোর বাবা এখনো জানে না।
- আমাকে জানাও নি কেন?
- তুই কষ্ট পাবি তাই বলিনি।

কী অদ্ভূত ব্যাপার! মা কষ্ট পাবে জেনে আমি বলিনি, আবার আমি কষ্ট পাব বলে মা বলেনি। অথচ দুজনে ঠিকই কষ্ট পেয়ে গেলাম।
আমি মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললাম, খুব কষ্ট লাগছে মা। তোমার লাগছে না?
- না।
- কষ্ট লাগছে না?
- কেন কষ্ট লাগবে?

আমি বিস্মিত হয়ে মায়ের দিকে তাকালাম। মা মোটেই অভিমানের স্বরে কথা বলছেন না। তাকে দেখে খুব স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। আমি অবাক হয়ে বললাম, তুমি বলতে চাচ্ছ এত কিছুর পরও তোমার খারাপ লাগছে না।
- না।
- কেন? নিজেকে মহামানবী প্রমাণ করতে চাও?

মা আবারো হাসলেন। কী নির্মল হাসি। কে বলবে এই মানুষটার জীবনে দুইটা ভূমিকম্প হয়েছে। মা বললেন, বোকা ছেলে! মহামানবী হবো কেন? তোর বাবা তো অন্যায় কিছু করেনি। আমি যখন তখন মারা যাব। তাকে তখন কে দেখবে? মানুষটা বড় বেশি আলাভোলা। সে কোনোভাবেই একা থাকতে পারবে না। সে এই জীবনে আমাকে কি দেয়নি? তার জন্য এই সামান্যটুকু মানতে পারব না?

বাবার বিয়ের খবরে আমি যতটা বিস্মিত হয়েছিলাম মায়ের এ কথা শুনে সমপরিমাণ বিস্মিত হলাম। বাবা যত বড় প্রতারক, মা তত বড় মহান। কোনোটারই দরকার ছিল না। দুজনেই স্বাভাবিক মানুষ হতে পারতেন। মা সুস্থ থাকতে পারতেন। একটা সুন্দর পরিবার হতে পারত আমাদের।
...
বাবা ফিরলেন রাত দশটায়।
বাবাকে দরজা খুলে দিয়েই আমার মাথায় আগুন ধরে গেল। কেমন বিধ্বস্ত একটা মানুষ। শার্ট ঘামে ভিজে জবজবে হয়ে আছে। চুল এলোমেলো। অন্য সময় হলে মায়া লাগত, এবার লাগল রাগ। মনে হচ্ছে নতুন সংসার সামলাতে গিয়ে বাবার এই করুণ দশা।
বাবা বললেন, খোকা! এক গ্লাস পানি দে তো বাবা।


"আপনার বউ পানি খাইয়ে দেয়নি" বলতে গিয়েও বললাম না। আমি পানি নিয়ে আসলাম। বাবার সাথে আজকে মুখোমুখি বসা উচিত। জানা দরকার কেন এমন হলো, কেন এমন করতে হলো।

বাবা শার্ট, স্যান্ডো গ্যাঞ্জি খুলে চেয়ারে বসলেন। বাবাকে শার্ট খুলতে দেখতেও আমার ঘেন্না লাগল। অশ্লীল একটা অনুভূতি। আমার চিন্তাজগতে এত ভয়ানক ধাক্কা লাগবে কখনো ভাবতেও পারিনি।
আমি চেয়ার টেনে বাবার সামনে বসলাম। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে খানিকটা উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন, তোকে ইদানিং অনেক বেশি চিন্তিত মনে হয়। কেনোরে?

প্রবল বিতৃষ্ণা চাপিয়ে আমি বললাম, এমনিই বাবা। চিন্তার কি আছে? ইন্টার পরীক্ষা দেব সামনের বছর। ভার্সিটিতে গেলেই বিয়ে করে ফেলব। বিন্দাস জীবন। চিন্তার কী আছে?

আমার কথা শুনে বাবা বড় রকমের ধাক্কা খেলেন। তিনি হতবিহ্বল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। অনেকক্ষণ পর বললেন, তোর হয়েছেটা কি বলতো?
- আপনাকেও চিন্তিত মনে হয় বাবা। আপনার কি হয়েছে বলবেন কি?

বাবা এক মুহূর্ত সময় নিলেন। আমার ধারণা এই সময়টুকু নিলেন যে মিথ্যে বলবেন সেটাকে গুছিয়ে নেয়ার জন্য। বাবা ঠিক সেটাই করলেন। নতমুখে বললেন, তোর মাকে নিয়ে চিন্তা করে কুল পাচ্ছিনা। এভাবে রাখলে তো বেশিদিন বাঁচানো যাবে না। যত দ্রুত সম্ভব টাকা যোগাড়ের ব্যবস্থা করতে হবে।
আমি বললাম, টাকা যোগাড় করা কি সম্ভব?
- হ্যাঁ সম্ভব। চেষ্টা চালাচ্ছি।
- আমার তো মনে হচ্ছে না সম্ভব।
- কেন?
আমি একটু দম নিলাম। বাবার দিকে তাকিয়ে একটু নিষ্টুর হাসি দিয়ে বললাম, মাত্র কদিন আগেই না নতুন করে বিয়ে করলেন? একটা বিয়ে তো কম কথা না। বিয়ের আয়োজন, বউকে গয়নাগাটি দেয়া, হানিমুন সব মিলিয়ে অনেক টাকা খরচ হয়ে যাওয়ার কথা। অপারেশনের টাকা যোগাড় হবে কীভাবে? আমার তো ধারণা আগে যে ডায়ালাইসিস হতো সেটাও এখন বন্ধ হয়ে যাবে। এতে অবশ্য অনেকগুলো লাভ। ডায়ালাইসিসের টাকা বাঁচল, মায়ের মতো বাতিল জিনিষের বদলে নতুন বউ ঘরে ঢুকার সুযোগ পেল।

বাবা পানি খাওয়ার জন্য আবারো গ্লাস হাতে নিয়েছিলেন। বাবার হাত থেকে গ্লাস পড়ে গেল। বিশ্রী কাঁচভাঙার শব্দ আমার কাছে মধুর মনে হচ্ছে। আমার ইচ্ছে হচ্ছে কাঁচ ভাঙার বদলে বাবার বুকের সবকটা পাজর ভেঙে যাক, গুঁড়িয়ে যাক। তাঁকে সর্বোচ্চ পরিমাণ আঘাত দেয়া গেছে ভেবে একটা অপার্থিব শান্তি পেলাম।

বাবা অনেকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলেন। ঘর জুড়ে অস্বাভাবিক নীরবতা বিরাজ করছে। পাশের ঘর থেকে মা দুএকটা কাশি দিচ্ছেন, এর বাইরে কোনো শব্দ নেই। নীরবতা যখন অসহ্য হয়ে গেল তখন বাবা মুখ তুলে তাকিয়ে বললেন, এই খবরটা কার থেকে শুনেছ?
- কার থেকে শুনেছি সেটা গুরুত্বপূর্ণ না। সত্য না মিথ্যা সেটা বড় কথা।
- ঘটনা সত্য।
- ঘটনা সত্য এটা আমরা জানি। আপনার নতুন করে বলার দরকার নেই।
- এই খবর তোমার মা ও জানে?
- জ্বি। আপনি লুকিয়ে রেখে খুব একটা সুবিধা করতে পারেন নি।

আব্বা আবারো মাথা নিচু করলেন। আনমনে একবার পীঠ চুলকে বললেন, তুমি কি জানতে চাও কেন আমি বিয়ে করেছি?
- বিয়ে মানুষ কেন করে সেটা বোঝার মতো বয়স আমার হয়ে গেছে। আপনি বাবা বলে সে আলোচনায় যেতে ইচ্ছে করছে না।
বাবা চলন্ত ফ্যানের দিকে তাকিয়ে বললেন, তাহলে এটাও তোমার জানা থাকা উচিত প্রতিটা গল্পের পেছনে গল্প থাকে।
আমি বললাম, জ্বী। আর তার পেছনে থাকে মিথ্যা, প্রতারণা, অজুহাত।
- কেমন মিথ্যা?
- এই যেমন আপনি বলতে পারেন মহিলাটা বড়ই দরিদ্র ছিল। মহিলাটিকে বিয়ে না করলে সেরা মারা যেত, তাকে দেখার কেউ নেই। কিংবা বলতে পারেন সে আপনার প্রেমে পড়ে গিয়ে গলায় ফাঁস দিয়েছে। আপনি তাকে বিয়ে না করলে ইঁদুর মারার বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করবে বলে হুমকি দিয়েছিল। আপনি নিতান্ত বাধ্য হয়ে বিয়ে করেছেন। এরকম কিছুই তো বলবেন, তাই না?

বাবা আনমনে মাথা এদিক ওদিক করলেন। বসা থেকে উঠতে উঠতে বললেন, জগত বড় কঠিন বাবা। এখনো পুরোটা দেখার বয়স তোমার হয়নি।

বাবা সারা জীবন এমন নীতি কথা বলেছেন। বাবার এসব কথাকে আমি মাথায় তুলে রেখেছি। আমার বয়স খুব বেশি না, কিন্তু আমি জানি বয়সের তুলনায় আমি অনেক বেশি বুঝি। এর কারণও বাবা। বাবা আমার পুরো জগৎ গড়ে দিয়েছেন। মায়ের অসুস্থতা নতুন কিছু না। অসংখ্য দিন বাবা অফিস থেকে ফিরে রান্না করেছেন। মায়ের প্রতি কোনো অভিযোগ ছিল না, কোনো রাগ ছিল না। সেই মানুষটা এই বয়সে এসে কীভাবে পথ হারান?
আমার ভীষণ কান্না পাচ্ছে। সব রাগ অভিমানে রূপ নিয়েছে। আমি বাবাকে উঠতে দেখে নরম গলায় বললাম, বাবা!
- বল বাবা!
- কেন এমনটা করতে হলো? এত বছর ধরে সবকিছু গড়ে শেষ সময়ে এসে ভাঙতে হলো? মা কে মৃত্যুর আগে এতটা কষ্ট না দিলে পারতেন না? বাবা কেন?

বাবা আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন। খানিকটা ইতঃস্তত করে আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, জগৎ খুব কঠিন জিনিষ বাবা। এক সময় বুঝবি। আরো কটা দিন যাক। এখন তুই রাগ করে বসে আছিস। এখন বললেও বুঝবি না। সময় যখন আসবে সব বলব।
বাবা পাশের ঘরে চলে গেলেন। তার প্রস্থান আমার কাছে অদ্ভূত অচেনা লাগল।
.
- কে খোকা নাকি?
বাড়িওয়ালার ঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। দরজা পার হতেই আমার কানে এই শব্দ আসল। শব্দটা আমার পরিচিত। ইনি আমাদের বাড়িওয়ালী।
ভদ্রমহিলা দরজা খুলে বললেন, আরে হ্যাঁ খোকাই তো!
- জ্বী। কেমন আছেন আপনি?
ভদ্রমহিলা চুল আচড়াতে আচড়াতে বললেন, ভালো কি আর থাকার উপায় আছে রে বাপ। দুনিয়া কি আর দুনিয়ে আছে? দুনিয়া হয়ে গেছে জাহেলিয়াত। ঘরে আসো, কথা বলি।

শহরে বসবাস করতে গেলে বাবা মায়ের কথা না শুনলেও বাড়িওয়ালার কথা শোনা বাধ্যতামূলক। আমি নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঘরে ঢুকলাম।
- বোসো খোকা। কেমন আছ?
- জ্বী ভালো।
- ভালো যে নাই সেটা তো বুঝিরে বাপ, বুঝি। মায়ের বয়স এখনো ৪০ হইল না। এত সুন্দরী মহিলা। তার হয়ে গেল ক্যান্সার।
- ক্যান্সার না আন্টি। কিডনী নষ্ট হয়েছে।
- ঐ একই। মরণব্যাধীর নাম রহিমা হইলেও যা, করিমা হইলেও তা। আহারে, তোমার মায়েরে দেখলে কত হিংসা করতাম। ৪০ বছরের মহিলারে মনে হইত ২৫ বছরের যুবতী।
আমি বিব্রত হয়ে বললাম, আন্টি আমার একটু বাজার করতে হবে।
- আরে বোসো, বোসো। বাজার দৌঁড়াচ্ছে না। তো এরকম হলো কীভাবে বলো তো?
- কিডনী রোগ যে কারোরই হতে পারে আন্টি। কারণ তো আর জানা যায় না।
আন্টি হাত থেকে চিরুণী রেখে বললেন, তোমার কিডনীর কথা তো বলছি না। বলছি তোমার বাবার কথা। এই বয়সে কীভাবে বিয়ে করে?

ঘরে ঢুকানোর সময়ই আমি এই আশংকা করেছি। খবর তাহলে এই মহিলা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে? পুরো এলাকা ছড়িয়ে পড়তে আর তাহলে বাকি নেই।
মহিলা আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে বললেন, বললাম না দুনিয়া হয়ে গেছে জাহেলিয়াত। তোমার বাবারে তো কম দিন হয় দেখিনা। কেমন নীরিহ নির্বোধ লোক মনে হইত। এরকম লোকের বউ যদি সুন্দরী হয় এরা সাধারণত আর দুনিয়া দেখে না। তোমার বাবা আমার ধারণা ভেঙে দিল।

আমি চুপ করে বসে রইলাম। আমার কিছু বলার নেই। তাছাড়া মহিলাকে দেখে মনে হচ্ছেনা উনি আমার থেকে কিছু শুনতে চান।

- পুরুষ মানুষ মেয়ে ছাড়া থাকতে পারে না। খুবই সত্য কথা। তাই বলে এই বয়সে বিয়ে করতে হবে? বউকে খাটিয়ায় রেখে! তোমার বাবা এমন করবে আশা করি নাই। পুরুষ মানুষগুলার উপর বিশ্বাস আর থাকতেছে কই? এদের এই সামান্য ধৈর্য নাই। বউ অসুস্থ বলে তুমি যদি এতই অস্থির হয়ে পড়ো তাহলে বাবা অন্য ব্যবস্থা করতে পারো। এই যে এখন সবখানেই...... কি সব বলতেছি! তুমি বাচ্চা মানুষ। তোমার সামনে এসব বলা উচিত না।
- জ্বী। আমি আসি আন্টি?
- আচ্ছা যাও। কিছু মনে কইরো না। আপন ভেবে অনেক কিছু বলে ফেলি।

আমি সিঁড়ির মুখে যেতেই আন্টি পেছন থেকে ডাক দিলেন।
- খোকা শুনো। আজকে মাসের ২৭ তারিখ। ভাড়াটা তাড়াতাড়ি দিয়ে দিয়ো। তোমাদের উপর এখন আর ভরসা করার উপায় নাই। কখন কি যে করে বসো।

আমি সিঁড়ি ধরে নামতে নামতে অস্পষ্ট আওয়াজ শুনলাম "কারে কি বলতেছি? খবর নিলে শোনা যাবে ছেলেও বিয়ে করে বাচ্চা এবরশন করাই ফেলছে। পুরুষ মানুষের উপর বিশ্বাস নাই।"

বাজার থেকে ফিরে মায়ের বিছানার পাশে বসলাম।
মা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোর চোখ মুখ এত শক্ত কেন?
আমি কঠিন স্বরে বললাম, মা! এখানে আর থাকা যাবে না। সবাই বাবার ব্যাপারটা জেনে যাচ্ছে। তোমার এই অবস্থাতে এত অসম্মান আমি মানতে পারছি না।
মা বললেন, মানুষের বলার মুখ আছে। মানুষ তো বলবেই।
- একটা সীমা আছে মা। আমরা গ্রামে চলে যাব।
- গ্রামে গেলে তোর পড়াশোনার কি হবে?
- যা খুশি হোক।
- আমার চিকিৎসা?
- একটা কিছু তো হবেই।
- তোর বাবার চাকরি?
আমি শান্ত গলায় বললাম, তুমি বাবাকে ডিভোর্স দিয়ে দাও মা। আমি আর মেনে নিতে পারছি না। কোনো যুক্তিতেই মানতে পারছি না।
মা শোয়া থেকে উঠে বসলেন। আমার দিকে কঠিন মুখে করে তাকিয়ে বললেন, বাবার উপর এত রাগ কেন তোর?
- রাগ করব না তো কি করব?
- তাকে কি খারাপ মানুষ মনে হয়?
- অবশ্যই।

মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, তোর বাবা খারাপ মানুষ না। তুই আমার থেকে তাকে বেশি চিনিস না। সে হয়তোবা একটা ভুল করেছে। একটা ভুলে একটা মানুষের সংজ্ঞা বদলে যায় না, তার সারা জীবনের সব অর্জন মাটি হয় না। মানুষ ভুল করবেই। ভালো মানুষ খারাপ মানুষের সংজ্ঞা ভুল থেকে না, উদ্দেশ্য থেকে টানতে হয়।

বাড়িওয়ালা আন্টির কথা তখনো আমার কানে বাজছে। আমি মেজাজ হারিয়ে বললাম, তুমি আবহমান কালের পতিভক্ত স্ত্রীর গলায় কথা বলছ মা। এত পতিভক্তি ভালো না। মহিলাদের আস্কারা পেয়েই পুরুষ মানুষ সাহস পায়।
মা কখনো রাগ করেন না। মায়ের চোখে মুখে বিরল রাগ ফুটে উঠল। তিনি চড়া গলায় বললেন, বেশি বুঝতে যাবি না। এই লোকের সংসার আমি করছি, আমি জানি। সারা দুনিয়া এসে যদি তাকে খারাপ বলে আমি তবু বলব না। আমার সামনে থেকে এখন যা।

আমি অস্ফুটে গলায় বললাম, হায়রে প্রেম!

আমার কথা মায়ের কানে চলে গেল। তিনি আমাকে কাছে ডাকলেন। আমাকে চরম বিস্মিত করে দিয়ে গালে চড় বসিয়ে বললেন, এই যে ডায়ালাইসিসের জন্য আমার মাসে মাসে এত রক্ত লাগে, এক ব্যাগ যোগাড় করেছিস? খবর নিয়েছিস তোর বাবা কোথায় এত ও নেগেটিভ পায়? এই রক্ত কি বললেই মেলে?
এখন এসেছিস মাতৃভক্তি দেখাতে। দুনিয়ার হিসাব এত সোজা না।

আমি মাতালের টলতে টলকে মতো নিজের ঘরে চলে আসলাম। মা এসব কি বললেন! এটা সত্য যে মায়ের রক্তের ব্যবস্থা সব সময়ই বাবা করেছেন। আমার দরকার পড়েনি, পড়লে নিশ্চয়ই করতাম। এখন এই সময়ে এসে মা এমন খোটা দেবেন?
জগৎ বোধহয় সত্যিই আজব। আমার কি জগৎ বোঝার মতো এতটুকু বয়স হয়নি?
...
মায়ের কিডনী অপারেশন হচ্ছে।

মায়ের কিডনী অপারেশন করা সম্ভব এই ব্যাপারটা আমরা কখনোই ভাবতে পারিনি। আমাদের কোনো সম্পত্তি নেই, ব্যাংকে টাকা নেই। বাবা সামান্য একটা বেসরকারি চাকরি করেন। ঘরের একমাত্র ছেলে হিসেবে আমি খুব ভালো করেই জানতাম বাবার চাকরির বাইরে আমাদের অন্য কোনো আয়ের উৎস নেই। তার উপর ও নেগেটিভ রক্তের কিডনী পাওয়া প্রায় অসম্ভব। মায়ের ডায়ালাইসিসের টাকা কষ্টে সৃষ্টে যোগাড় হবে, ডায়ালাইসিস চলবে, এক সময় মা মারা যাবেন... এটাই জেনে এসেছি এতদিন। সে হিসেবে এই অপারেশন আমার জন্য প্রায় অসম্ভব একটা ব্যাপার।

মাকে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকানো হয়েছে। গত পনের দিনে যা ঝড় চলে যাবার, চলে গেছে। এই মুহুর্তে প্রার্থনা ছাড়া আর কিছু করার নেই। অপারেশনে সময় লাগবে। বাবা ওটি রুমের সামনে থেকে আমাকে হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে আসলেন। উৎসুক গলায় বললেন, খোকা চা খাবি?
- জ্বী।
- চল বাইরে থেকে চা খেয়ে আসি।

হাসপাতাল থেকে খানিকটা দূরে নির্জন একটা চায়ের স্টল থেকে ওয়ান টাইম কাপে করে বাবা দুই কাপ চা নিলেন। রাতের নির্জনতার মধ্যে সবকিছু কেমন জানি অপার্থিব মনে হচ্ছে। বাবা আমার হাতে চায়ের কাপ ধরিয়ে দিয়ে বললেন, খোকা!
- জ্বী বাবা!
- আমার উপর আর রাগ আছে?
- আমাকে মাফ করে দিন বাবা।

বাবা হাসলেন। মোটামুটি নীরব দেখে একটা জায়গায় বসে আমাকেও বসার জন্য ইশারা দিলেন। নরম গলায় বললেন, আমি কখনোই তোর উপর রাগ করিনি খোকা।
- আপনি সবকিছু কেন কখন পরিষ্কার করেন নি?

বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, পরিষ্কার করতে গেলে সমস্যা হতো তখন। আমি তাহমিনার থেকে টাকা নিয়ে তোর মায়ের চিকিৎসা করাব এটা তোর মা মানতে পারত না। কখনোই না। অথচ এর বাইরে আমার কিছুই করার ছিল না।

- জ্বী বাবা।

- তাহমিনা মানুষটা অনেক ভালো, জানিস? সে যখন তোর মায়ের অসুখের খবর জানল, এত ভেঙে পড়ল! আমি আশ্চর্য হয়ে দেখলাম তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। আমার স্ত্রীর জন্য আমি এবং তুই ছাড়া আর কেউ কাঁদেনি। আমি তখনই মানুষটার প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে গেলাম। তারপর সে যখন বলল তার অনেকগুলো টাকা অযথা পড়ে আছে এবং সে টাকা যদি আমি নিই তবে সে খুশি হবে, তখন কেন জানি মনে হলো আকাশ থেকে ফেরেশতা নেমে পড়েছে।

আমি বললাম, উনি কেন এত টাকা এভাবে ফেলে রেখেছেন?

- বিতৃষ্ণায়। জীবন তাকে প্রচণ্ডভাবে ধোঁকা দিয়েছে। সে জীবনের প্রতি সকল আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিল।

- তারপর?

- টাকার লোভ আমার কখনো ছিল না, জানিস? জীবনে এই প্রথম টাকার লোভে পড়লাম। আমার কাছে যে কোনো মূল্যে তোর মাকে বাঁচানোর ইচ্ছে ছিল। আমি কিছু ভাবতে পারিনি। টাকার প্রতি লোভ ছেড়ে দেয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু অপারেশন করানোর মতো বিকল্প কোনো পথ আমার আর জানা ছিল না।

- হু।

- তারপর একদিন সে জানাল তার নিজের রক্তের গ্রুপ ও নেগেটিভ এবং আমি চাইলে তার একটা কিডনী নিতে পারি।আমি না তখন অনেকটা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেললাম। তাকে ভদ্রতার খাতিরেও না বলিনি। কেমন নির্লজ্জের মতো কিডনী দেবে জেনে খুশি হয়ে গেলাম।

আমি ঘোর লাগা গলায় বললাম, আর উনি সত্যি সত্যিই টাকার সাথে সাথে কিডনীও দিয়ে দিলেন?

- হ্যাঁ। তোর নিশ্চয়ই মনে হচ্ছে ঘটনা তো এখানে শেষ হলেই পারত। বিয়ে কেন করতে গেলাম?

- আমার কিছুই মনে হচ্ছে না বাবা। আপাতত আমি সব প্রশ্নের উর্ধ্বে।

বাবা বললেন, না। তোর জানা উচিত। তাহমিনার থেকে টাকা নেয়ার পর কিছুদিনের মধ্যেই আমার মধ্যে গভীর অনুতাপ চলে আসল। সম্পূর্ণ একা একটা মানুষ, যতই টাকার প্রতি বিতৃষ্ণা থাকুক, তার বেঁচে থাকার জন্য টাকা সবচেয়ে বেশি দরকার। একটা একা নারীর জীবনে যখন তখন টাকার দরকার পড়বে। আমি সে হিসেবে তাকে শূন্য করে দিয়েছি। তার একটা কিডনী এনে তাকেও তোর মায়ের পথেই ঠেলে দিচ্ছি।

- আপনি অনুতপ্ত হয়ে গেলেন?

- কঠিনভাবে। আমি কি করব তখন ভাবতে পারছিলাম না। তোর মাকে বাঁচানো সবচেয়ে বেশি দরকার। তাই বলে আরেকটা মানুষকে তো ধ্বংস করে না। তারও একটা আশ্রয় দরকার।

- তারপরই আপনি বিয়ের প্রস্তাব দিলেন?

- হ্যাঁ। খুব যে ভেবে চিন্তে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি তা না। তাকে প্রস্তাব দিয়েছি ঘোরের মধ্যে।

- উনি প্রস্তাব শুনে কি বললেন?

- সে হাসল। তারপর সরাসরি না করে দিল। কিছুটা কঠিন স্বরে বলল, আপনাকে জানি বলে কিছু মনে করলাম না। অন্য কেউ হলে কঠিন অপমান করতাম। বয়স ৩৫ হয়ে গেছে, বাকি জীবন এমনিই কেটে যাবে। আমাকে দয়া দেখাতে হবে না।

- আপনি রাজি করলেন কীভাবে?

- বললাম রাজি না হলে টাকা ফেরত দিয়ে দেব। অবশ্য টাকা সত্যি সত্যিই সাথে নিয়ে গিয়েছিলাম। হুমকিটা মিথ্যে ছিল না। রাজি না হলে টাকা ফেরত দিতাম। অনুতাপ নিয়ে বাঁচা সম্ভব ছিল না। তারচেয়ে বড় কথা তোর মাকে তো আমি চিনি। সে জানতে পারলে আমার চেয়ে বড় অনুতাপ নিয়ে বেঁচে থাকত।

- শেষ পর্যন্ত রাজি হলেন কীভাবে? আর মা কে বিয়ের ব্যাপারটা জানালেই তো পারতেন। মা তো মেনেই নিয়েছেন।

বাবা আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন,তোর মাকে জানাইনি অন্য কারণে। তাকে জানালে সে টাকা আনতে রাজি হতো না। এরচেয়ে মরে যাওয়াকেই বেশি প্রেফার করত। এখন বিয়ে করে ফেলেছি বলে তার কিছু করার থাকছে না। অবশ্য সে এখন পর্যন্ত পুরো সত্যটা জানে না।

আমার পাশ ঘেষে ফোঁস করে একটা প্রাইভেট কার চলে গেল। বাবা চুপ হয়ে গেলেন। আমিও কিছু বলতে পারছি না।

বাবা বেশ কিছুক্ষণ পর বললেন, তাহমিনাকে রাজি করাতে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। একটা জেদ চেপে বসেছিল।

- শেষ পর্যন্ত কি বলে রাজি করালেন?

- বললাম আমার স্ত্রীকে আমি কতটা ভালোবাসি সেটা তো বুঝতেই পারছ। তোমাকে তারচেয়ে কম বাসব না। দুজনকে ভালোবাসতে গিয়ে হয়তো ভাগে কম পড়বে। এই দয়াটুকু করতে হবে আমাকে।

- অদ্ভূত।

- খুবই অদ্ভূত। জীবন সত্যিই অদ্ভূত। এই যে পিতা হয়ে তোর সাথে এসব নিয়ে কথা বলছি, এটাই কম অদ্ভূত? তুই মাকে ওটি টেবিলে রেখে এসব কথা শুনছিস এটা কি স্বাভাবিক কিছু?

আমি বললাম, না।

বাবা একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, জীবনে আমরা যা ভাবি তার অনেক কিছুই আসল না। যেসব জিনিষকে আমরা ভুল ভাবি তার সবকিছু ভুল নয়, যাকে পাপ ভাবি তার অনেক কিছুই পাপ নয়। দৃষ্টিভঙ্গিকে কোনো নির্দিষ্ট খাপে ভরে ফেলা উচিত না। পৃথিবীর প্রতিটা মানুষের আলাদা আলাদা গল্প আছে, জীবন আছে, পৃথিবী আছে। যার যার পৃথিবীতে সত্য আলাদা, মিথ্যে আলাদা। আমরা কারো জীবন কেউ দেখিনি। আমরা নিজের সংজ্ঞায় অপরকে ফেলে দিই। এটা খুব বড় ভুল।

আমি মুগ্ধ হয়ে বাবার কথা শুনছি। এই তো আমার বাবা, এটাই আমার বাবা। এটাই সেই মানুষ যে কথার জাদুতে আটকে রাখে, বিশ্বাসের জাদুতে বন্দি করে।

আমি প্রসঙ্গ একটু ঘুরিয়ে বললাম, সগীর আংকেল আপনার ব্যাপারে জানল কীভাবে?

বাবা একটু বিব্রত হয়ে বললেন, একমাত্র সে এই বিয়ের ব্যাপারে জানত। আমি তাকে বিশ্বাস করেছিলাম। সে বিয়ে করতে আমাকে উৎসাহিত করেছে। কিন্তু বিয়ের পর সে যখন তাহমিনার টাকার কথা জানল তখন আমার কাছে দুই লাখ টাকা চেয়ে বসল। অনেকটা ব্লেকমেইল করার মতো।

আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, উনি এত নিচে নামতে পারল?

বাবা মিষ্টি করে হেসে বললেন, মানুষের উপরে নিচে উঠিনামার কোনো সীমা পরিসীমা নেই। সে প্রথমে ভেবেছিল বিয়ে করে আমি ধ্বংস হয়ে যাব তাই উৎসাহিত করেছে। পরে যখন সত্য জেনে গেল তখন উল্টোদিকে ধ্বংস করতে গেল।

বাবা কিংবা আমি কেউ ই চায়ের কাপে একটাও চুমুক দিই নি। চা ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। বাবা হাত থেকে চায়ের কাপ ফেলে দিয়ে বললেন, চল আবার চা খাব। ঠাণ্ডা চা খাওয়ার কোনো মানে নেই।

আমিও উঠে দাঁড়ালেন। চা ফেলে দিয়ে বললাম, উনি এখন কেমন আছেন?
- কে তাহমিনা?
- জ্বী।
- মা বলতে অস্বস্তি লাগছে, তাই না? হাহাহা। সে ভালো আছে, আনন্দে আছে। কিডনী দিতে গিয়ে তারও একটা অপারেশন করতে হয়েছে।সুস্থ থাকলে আজকে সে থাকত।

- আচ্ছা।

বাবা আস্তে করে পা ফেলতে ফেলতে বললেন, তোর মাকে আমি বড় বেশি ভালোবাসিরে বাবা। তার রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ। তোর পরে এ কারণে আর কোনো বাচ্চা নিইনি। শুনেছি বাচ্চা নিতে গেলে নাকি তার ক্ষতি হতে পারত। আজকে দ্বিতীয় বিয়ে করে সমাজের চোখে ভিলেন হলাম, সেটাও তারই জন্য। তাহমিনাকে বিয়ে করা ভুল হলো কিনা এখনো জানি না। সেটা সময় বলবে।

আমার কেন জানি চোখ ঘোলা হয়ে আসছে। মায়ের এত বড় অপারেশন হচ্ছে,জীবন মৃত্যু দাঁড়িয়ে আছে পাশাপাশি। আমার তবু একটু ভয় লাগছে না। মনে হচ্ছে জীবন খুব বেশি খারাপ না। অত অসুখ, এত বিচিত্রতা আর মৃত্যুর আতংকের পরেও।

আমি বাবাকে বললাম, আমার জন্য আপনার কোনো উপদেশ আছে বাবা?

বাবা এক মুহুর্তের জন্য থামলেন। আমাকে এক হাতে জড়িয়ে নিয়ে শান্ত গলায় বললেন, চোখ দিয়ে কিছু দেখামাত্র সেটাকে সত্য ভাবতে নেই, কান দিয়ে কিছু শোনামাত্র সেটাকে বিশ্বাস করতে নেই। চোখ, কানের সীমাবদ্ধতা আছে। চোখ দেখতে পারে, শুনতে পারে না। কান শুনতে পারে দেখতে পারে না। একই সাথে দেখা,দেখা আর অনুভব করার কাজ কেবল হৃদয় করতে পারে। সবকিছুকে পরিমাপ করতে হয় হৃদয় দিয়ে। জগতের কিছু সত্য মিথ্যের চেয়ে কুৎসিত, আর কিছু মিথ্যা সত্যের চেয়ে পবিত্র।

আমি বাবার কথা শুনছি। আমার হাজার বছরের বাবা। আমার শিক্ষক, আমার অর্ধেক পৃথিবী।

আমার দৃষ্টিকোণে লোনাপানির প্রবাহ কমছেই না। বাবার জড়িয়ে ধরা বাহুডোরে আবদ্ধ হয়েও অস্থির লাগছে।
আমি বললাম, বাবা আমি একটু কাঁদতে পারি?

বাবা কঠিন গলায় বললেন, না। তোর মা সুস্থ হওয়ার পর সব কান্না। সকল আনন্দ আর সকল কান্না আমরা চারজন মিলে ভাগাভাগি করব।

আমার মুহুর্তের জন্য মনে পড়ল আমরা আর তিনজন নেই। মুহুর্তের ভুলে কিংবা শুদ্ধতায় আমরা তিনজন থেকে চারজন হয়ে গেছি।

আমার চোখ তবুও চিকচিক করছে। আমি আটকা পড়ে গেছি ভুল শুদ্ধের মাঝামাঝিতে। জগতের ভুল আর শুদ্ধের হিসাব সত্যিই কি কেউ জানে?

মনে হয়না। তবে এটা জানি দৃষ্টিকোণে আটকে পড়ে যে অশ্রু, সে বড় বেশি পবিত্র, বড় বেশি নির্মল। আমি না দেখেও বলতে পারি বাবার চোখেও এখন অশ্রু জমে আছে। তিনি ঠিক কার জন্য কাঁদছেন কে জানে!

জগতে কেউ কিচ্ছু জানে না। জগতের কিচ্ছু কেউ জানে না।

লেখক: জয়নাল আবেদীন