জানলে অবাক হবেন, বিশ্বের ক্ষুদ্রতম মসজিদটি বাংলাদেশে!

জানলে অবাক হবেন, বিশ্বের ক্ষুদ্রতম মসজিদটি বাংলাদেশে!

নিউজডেস্ক২৪: পৃথিবীর অন্যকোনো দেশে তিনজনের নামায পড়া যায় এরকম ছোট মসজিদের অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা যায়নি। সে হিসেবে ধারণা করা হয় এটাই বিশ্বের ক্ষুদ্রতম মসজিদ। বগুড়ার প্রাচীনতম জনপদ সান্তাহার। এখানে একটি গ্রামের নাম তারাপুর। এই গ্রাম একসময় রানী ভবনীর শাসনাধীন ছিলো। ধারণা করা হয় তার সময়ে এই মসজিদ নির্মান করা হয়েছে। সে হিসেবে মসজিদের বয়স কমপক্ষে তিনশ বছর।

বর্তমানে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে মসজিদটি। এখানে আর নামাজ পড়ে না কেউ। শুধুমাত্র কালের স্বাক্ষী হয়ে আছে এই মসজিদ। ধারণা করা হয় মুসলমানের সংখ্যা কম ছিলো বিধায় এই ছোট মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছে। এই মসজিদ নির্মাণ নিয়ে কয়েকটি মত প্রচলিত আছে।

১৮০০ খৃঃ শেষ ভাগে ভারত উপমহাদেশে যে সামাণ্য কয়েকটি শহর দ্রুত আধুনিক হয়ে ওঠে সান্তাহার তার মধ্যে অন্যতম। বর্তমানে এটা সান্তাহার নামে পরিচিত হলেও এর পূর্ব নাম সুলতানপুর। মূলত তখন এটি রাজশাহী জেলার অন্তর্গত ছিলো।

সান্তাহার থেকে ৩ কিলোমিটার ভেতরে তারাপুর গ্রাম। গ্রামের আঁকাবাঁকা রাস্তা , ছায়া ঢাকা, পাখি ডাকা শান্ত এক জনপদ যেখানে মাটির সারিসারি এক তলা, দুই তলা বাড়ী পেরিয়ে হেঁটে যেতে হবে। সুনসান জায়গা। দেড়শ’ বছরের অধিক সময় ধরে এই মসজিদে নামাজ পড়া বন্ধ হয়ে আছে।

১. এলাকায় ওই সময়ে মাত্র ৩ জন মুসলমান বা মুসল্লি ছিলো বিধায় তারা তিনজনের জন্য এই মসজিদটি নির্মাণ করেছেন।

২. এলাকাটি হিন্দু অধ্যুষিত ছিলো বিধায়। মুসলমানরা কিছুটা কোনঠাসা ছিলো। তাই ছোট আকারে কেবলমাত্র আযান দিয়ে ছোট একটা জামাত করার জন্য এই তিনজনের মসজিদ বানানো হয়েছে। কারণ তিনজন মিলেই জামাতে নামায পড়তে হয়। অনেক আলেম মনে করেন তিনজনের কমে জামাতে নামায পড়া যায়না এমন ধারণা থেকে এই মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে।

৩. কোনো এক ভিনদেশী ইসলাম প্রচারক এই গাঁয়ের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কিছুকাল এখানে যাত্রাবিরতি করেন মূলত তিনিই এই মসজিদ নির্মাণ করেন। যদিও ইতিহাস কিংবা শিলালিপিতে এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়না।

৪) আরেকটি মত হলো সান্তাহারের ছাতিয়ান গ্রাম ইউনিয়নের রানী ভবানীর বাবার বাড়ি। সান্তাহারের আশপাশসহ আমাদের তারাপুরও রানী ভবানীর বাবার রাজ্যত্ব ছিল। তারই অংশ হিসেবে রানী ভবানীর আসা-যাওয়া ছিল এ গ্রামে। একজন মুসলমান মহিলা এই গ্রামে ছিলেন, যিনি পরহেজগার। হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা হওয়ার কারণে ওই মহিলার নামাজ পড়ার অনেক অসুবিধা হতো। রানী ভবানী এমন কথা জানতে পেরে তিনি নিজেই এই গ্রামে চলে আসেন আর সেই মহিলাকে যেন কেউ তার নামাজ পড়াতে অসুবিধা না করতে পারে, সে জন্য তার পেয়াদারদের হুকুম দেন তার জন্য রাজকীয় নকশায় একটি মসজিদ তৈরি করে দেওয়া হোক। ধারণা করা হয় অন্য রাজ্য থেকে মিস্ত্রি এসে মসজিদটি তৈরী করে দেয়া হয়েছে।

৫) কোনো এক কারণে গ্রামবাসীরা নাকি তাঁর পরিবারকে একঘরে করে দিয়েছিল। সে পরিবারটি পরে নিজেদের নামায পড়ার জন্য বাধ্য হয়ে এই ছোট মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন।

৬) হিন্দু জমিদারদের দখলে ছিল এলাকাটি। তবে কয়েকজন মুসলমান পেয়াদা কাজ করতেন এখানে। তারা হয়তো রাজকর্মচারী অথবা কারিগর। ধারণা করা হয় যেহেতু গ্রামে হিন্দুদের মন্দির আছে। কিন্তু কয়েকঘর মুসলমান থাকলেও তাদের প্রার্থনালয় নেই। তাই পেয়াদা কিংবা স্থাপত্য কারিগররা মসজিদটি নির্মাণ করেন। অথবা জমিদারের পেয়াদা ছিলেন বলে মসজিদটি নির্মিত হয় বিশেষ ব্যবস্থায়। তাই দেখতে এটা রাজকীয় পুরাকীর্তির মতোই।’

লম্বায় এই মসজিদের উচ্চতা ১৫ ফুট আর প্রস্থ৮ ফুট, দৈর্ঘ্য ৮ ফুট,, এটা বাইরের দিকে। ভেতরে আরো কম। মসজিদের দরজার উচ্চতা ৪ ফুট আর চওড়া দেড় ফুট। একটি মানুষ অনায়াসে সেখানে ঢুকতে বা বের হতেপারবে। একটি গম্বুজ মসজিদ। জানালা নেই। দরজার উচ্চতা ৪ ফুট, চওড়ায় দেড় ফুট। একসঙ্গে একজন মানুষই ঢুকতে পারবে। ইটের তৈরি দেয়ালের পুরুত্ব দেড় ফুট। ইটগুলোর প্রতিটি অর্ধেকই ভাঙা। মসজিদের দরজায় দুটি রাজকীয় আদলের খিলান আছে। মুসলিম স্থাপত্যের নিদর্শন সংবলিত মিনার, খিলান ও মেহরাবই এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

বৃষ্টির সময় বিভিন্ন স্থান দিয়ে পানি ঢুকে মসজিদটির ভিতরে। দুটি রাজকীয় নির্দেশনার নির্মিত খিলান চোখে পড়ে মসজিদের দরজায়। এর মেহরাব থাকলেও সেটিও ঐতিহ্য হারাচ্ছে। যত্নের অভাবে মসজিদটির ওপরে ও চারপাশে গাছপালায় ভরে গেছে। এ কারণেও ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছে মসজিদটি। গাছপালার ভিতরে পোকা-মাকড় থাকতে দেখা যায়।

যদি এটি বিশ্বের ছোট মসজিদ হয়ে থাকে। তাহলে এটিকে শীঘ্রই বিশ্বের ঐতিহ্যের অংশ ঘোষনা করা উচিত। এবং বাংলাদেশ প্রত্নতত্ম বিভাগের উচিত এটি সংরক্ষনে এগিয়ে আসা। এলাকাবাসীর দাবীও তাই।

উল্লেখ্য ভারতের ভূপালে যে মসজিদটিকে বিশ্বের সবচেয়ে ছোট মসজিদ বলে দাবী করা হয়। ভারতের মধ্যপ্রদেশের এই মসজিদটিকে অনেকে ভারতের বা এশিয়ার এমনকি বিশ্বের সবচেয়ে ছোট মসজিদ বলে থাকেন। এছাড়া সম্ভবত আফ্রিকার একটি মসজিদের ছবি পাওয়া গিয়েছে মাইকসহ। ফেসবুকে পোস্ট করা এই ছবিতে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। যদি দাবী অনুযায়ী এটা মসজিদ হয়। তাহলে সেটা সাপ্তাহার মসজিদটির চেয়ে ছোট হবে না। তবে নিচু হবে। এছাড়া আরেকটি ছবিতে নামায পড়ার একটা চাউনি মসজিদ দাবী করে একজন বলেছেন এটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোট মসজিদ।

কিভাবে যাবেন?

ঢাকা থেকে সান্তাহার যাওয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো উপায় হলো ট্রেনে যাওয়া। সান্তাহার রেলওয়ে জংশন একটি পরিচিত জায়গা। ট্রেনে ৪০০-৫০০ টাকার মতো। যেহেতু সান্তাহার উপজেলাটি নওগাঁ জেলা সংলগ্ন। তাই উত্তরবঙ্গের বা নওগাঁর বাসে গিয়ে সান্তাহার নেমে গেলে হবে। বাস ভাড়া ৪৫০ টাকা। সময় লাগে ৬ ঘন্টা। এসি গাড়ির ভাড়া ৯০০ থেকে ১১০০। সান্তাহার থেকে তিন কিলোমিটার যদি ভ্যান ভাড়া করে যান খরচ পড়বে ৩০ টাকা। সময় লাগবে ১৫ মিনিট।