ঢাকা, রোববার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ০৮ আশ্বিন ১৪২৫ | ১২ মহররম ১৪৪০

ভারতকে ভিন্নভাবে চেনাবে সাগরকন্যা কেরালা

ভারতকে ভিন্নভাবে চেনাবে সাগরকন্যা কেরালা

নিউজডেস্ক২৪: বিশ্বের বাঘা বাঘা সব ভ্রমণস্থানের গল্প করতে গেলে ভারতের সাগরকন্যা কেরালার নাম আসবেই আসবে! “ঈশ্বরের নিজের দেশ” খ্যাত ভারতের সর্ব দক্ষিণের এই জায়গা কেড়ে নিয়েছে ভ্রমণ পিপাসুদের নজর। ইন্ডিয়ান হিল স্টেশন, আবদ্ধ জলাভূমির হাউজবোট, বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য, বিশ্ব বিখ্যাত সমুদ্র সৈকত- কী নেই কেরালায়! দক্ষিণ উপকূলীয় সাগর আর আরব সাগরের মিলন কেরালাকে করেছে আরো সুন্দর। চলুন তাহলে দেখে আসা যাক কেরালার বিখ্যাত কিছু স্থান, যা না দেখলে হাতছাড়া হয়ে যাবে অনেক কিছুই।

আরও পড়ুনঃ পাহাড়-ঝরনায় আপনাকে মুগ্ধ করবে মেঘালয়

কেরালায় কয়েকদিন বেড়িয়ে এসে দেখে এলাম একদমই ভিন্ন রকম এক ভারত। যে ভারতের সাথে ভারতের অন্যান্য প্রদেশের তেমন কেন, কোন রকম মিলই নেই! মানুষ থেকে শুরু করে, তাদের ভাষা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, আর পুরো পরিবেশগত পার্থক্য। যা অন্যান্য ভারত থেকে এই ভারত থেকে পুরোপুরি আলাদা করে ফেলেছে। অবাক চোখে দেখেছি, থেকেছি, খেয়েছি, ঘুরেছি আর ভেবে গিয়েছি, এ কোন ভারত? এক কোন জগৎ? এ কোন পরিবেশ? এখানে শুধু দুইদিন কেরালা আর কোচিন ঘুরে যেসব পার্থক্য চোখে পরেছে সেগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

কেরালা স্টেশনে নেমেই একরাশ মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হয়েছি, ঝকঝকে স্টেশন, স্টেশনে যাত্রীদের জন্য অল্প খরচে দারুন আরামদায়ক এসি বিশ্রাম কক্ষ আর বাথ পরিচ্ছন্ন বাথরুমের ব্যবস্থা দেখে, সাথে আরাম করে নিশ্চিন্তে গোসলের সুব্যাবস্থা। টিকেট থাকা সাপেক্ষে প্রতি ঘণ্টায় মাত্র ২৫ রুপির বিনিময়ে।

আরও পড়ুনঃ বিশ্বের কিছু ভূতুড়ে শহর

দ্বিতীয়ত অবাক করার মত ছিল খাবারের ব্যাপার। যখন কেরালা যাবার কথা হয়েছে, তখন থেকেই সবাইকে বারবার বলে আর বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে যে ওদিকে গিয়ে কেউ যেন ভুলেও মাংস খেতে না চায়। মাংসের নামই যেন না নেয় মুখে, বিফের কথা যেন ভুলেও উচ্চারণই না করে! শুধু সবজি, ডিম আর খুব বেশি হলে মাঝে মাঝে মাছ খুঁজে দেখা যেতে পারে। কিন্তু গিয়ে দেখি একদম ভাবনার উল্টো সব ব্যাপার স্যাপার। হোটেল গুলোতে প্রায় সব রকম খাবার পাওয়া যায়, সবজি আর মাছ থেকে শুরু করে সব রকম মাংস, এমনকি গরুর মাংস পর্যন্ত আছে!

রান্না বা কাবাব! আর সব খাবারের দামও সাধ্যের চেয়েও তুলনামুলক কম!

তৃতীয় অবাক করার মত আর সবচেয়ে মুশকিলের ব্যাপার ছিল ওদের ভাষা! হ্যা ভাষাই, ওরা ভারতীয় হলে কি হবে? না জানে হিন্দি না তেমন ইংরেজি! ওরা শুধু ওদের তামিল ভাষা ছাড়া তেমন কিছুই জানেনা। অধিকাংশই এমন। যে কারনে একদিন সকালে নাস্তা খেতে হোটেলে গিয়ে ডিম পোঁচ বা ভাজি খাবো সেটা বোঝাতে ৪০ মিনিট অপেক্ষা করার পরে দূরের এক দোকান থেকে হিন্দি বোঝে এমন একজনকে খুঁজে নিয়ে আসার পরে তাদের বোঝাতে হয়েছে!

আরও পড়ুনঃ সাগরের নিচে বাংলো, এক রাত থাকার খরচ ৩৩ লাখ!

চতুর্থ পার্থক্য ধর্ম। ভারতের অন্যান্যপ্রদেশে মুসলিমরা কোনঠাসা হয়ে অনাহুতর মত কোন রকমে বেঁচে থাকলেও কেরালাতে নিজেদের সম্মান নিয়েই আছে। যেটা ভারতের অন্য কোন প্রদেশে দেখা যায়নি। আমি অন্তত পাইনি। এখানে অনেক অনেক মসজিদ, নিয়মিত সুমধুর আযানের ধ্বনি, নামাজ আর পরহেজগার নারী পুরুষের অবাধ বিচরণ বেশ অবাক করেছে।

পঞ্চমত, কেরালা প্রদেশের মুল যে শহরটি, সেটির নাম ইরনাকুলাম। আর কেরালার এই মুল শহরটিকে পরিস্কার দুইটি ভাগে ভাগ করা যায়। ইরনাকুলাম যেটা আধুনিক কেরালা। একদম ঝকঝকে, তকতকে, আধুনিক, আর ব্যস্ততম এক শহর। যে শহরের রাত আর দিনকে আলাদা করা মুশকিল। যে শহরের কিছু কিছু যায়গা তো এমন যে, গাড়ির শোরুম, শপিং মল, রেস্তরা, ব্যাস্ততা আর অতি আধুনিক ছেলে মেয়েদের দেখা বোঝার কোন উপায় নেই যে এটা ভারত নাকি পশ্চিমা কোন দেশ!

অথচ মাত্র কয়েক কিলোমিটার পশ্চিমে গেলেই চোখে পরবে পুরনো, নিরব, নির্জন, কোচিন শহরের অন্য এক কেরালার।যেখানে আলো আছে কিন্তু ঝলমলে নয়, শপিং এর যায়গা আছে কিন্তু অতি আধুনিক নয়, রেঁস্তরা আছে কিন্তু অভিজাত নয়, মানুষ আছে কিন্তু ব্যাস্ততা নেই, ছেলে মেয়েদের আড্ডা আছে, কিন্তু সাধারন মানের। এখানে সবকিছু পুরনো, বনেদী, ধীর স্থির আর ঐতিহাসিক। কোচিন শহর তার সবটুকু পুরনো ঐতিহ্য যেন ধরে রেখেছে।

কোচিনের সরু রাস্তাঘাট, খোলা ময়দান, পুরনো ঘর বাড়ি, মসজিদ, মন্দির, গির্জা, দুর্গ, বিমান বন্দর, সমুদ্র তীর, খোলা প্রান্তর, সাগরের সাথে লাগোয়া গভীর নদী, পুরনো সেতু, জেটি, ডক ইয়ার্ড, নোঙ্গর, ফেরিঘাট, হোটেল ইত্যাদি। সবকিছুই যেন ঐতিহ্য আর ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে তেমনই রয়ে গেছে বা রাখা হয়েছে। দারুন লেগেছে এই কোচিনকে। কিন্তু আফসোস সেখানে থাকা হয়নি, সেই সময় মেলেনি ধীর স্থির আর নীরব, আর ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে ছুঁয়ে দেখে অনুভব করতে পারিনি বলে।

আর সর্বশেষ, হল কেরালার ঐতিহ্যবাহী আর বিখ্যাত কাঞ্চিভরন এবং সিল্ক শাড়ি। এই শাড়ি এমনি এক শাড়ি যে নারী কেন, যে কোন পুরুষ মানুষই এই শাড়ির দোকানে ঢুকলে তার মাথা ঠিক রাখতে পারবেন না আমি নিশ্চিত! কি রঙের, কি ধরনের, কেমন দামের, কোন ডিজাইনের, কোন ধরনের মানুষের জন্য কেমন শাড়ি আপনি চান? সব আছে সব।

আরও পড়ুনঃ প্রকৃতির বিস্ময়কর সৌন্দার্য্যের আরেক নাম ‘নায়াগ্রা জলপ্রপাত’!

এইসব শাড়ির কোন একটা দোকানে ঢুকে পড়লে আপনি কোন ভাবেই ভাগ্যের হাত থেকে বাঁচতে পারবেন না। পর্যাপ্ত টাকা না থাকলে পারবেন না পরিবারের চিরন্তন খোটা থেকে মুক্তি পেতে, আর টাকা থাকলে পারবেন না, সব কিভাবে কিভাবে নিঃশেষ হয়ে গেল সেই আফসোসে জ্বলে পুড়ে!

মোট কথা এই শাড়ির দোকানে একবার ঢুকতে পারলে আপনি কোন ভাবেই ভাগ্যের কাছে জয়ী হয়ে খুশি মনে ফিরতে পারবেন না। ভাগ্য এখানে আপনাকে পরাজিত করবেই। সেটা যেভাবেই হোক!

আর কেরালার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর বৈচিত্রের কথা তো বলাই হলনা। কি চান আপনি? পাহাড়-সমতল সমুদ্র-অরন্য-নদী-ঝর্ণা-চা বাগান নাকি জলপ্রপাত? সব আছে সবই পেতে পারেন দুই থেকে চার ঘণ্টার দূরত্বের মধ্যেই। একই সাথে এমন সব রকম প্রাকৃতিক বৈচিত্র ভারতের আর কোন প্রদেশে আছে বলে আমার জানা নেই।